নিজ গৃহে বন্দী

"আমার মনে হচ্ছিল, আমার ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেছে, আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎও শেষ হয়ে যাবে, " -এ কথাগুলো বলছিলেন ফরাসি নাগরিক সিলভি ইয়াসমিনা। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার বারা এলাকা থেকে তাঁকে তাঁর পাঁচ সন্তানসহ একটি জরাজীর্ণ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সেখানে পৌঁছে দেখতে পায়, সিলভি ও তাঁর সন্তানরা একটি অসমাপ্ত, ভাঙাচোরা ঘরে বসবাস করছেন। তাঁদের সবার শরীরে ছিল নির্যাতনের চিহ্ন। উদ্ধার অভিযান সম্ভব হয় কারণ সিলভির বড় ছেলে কোনোভাবে পালিয়ে গিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। সেখানে সে পুলিশকে জানায়, সে ফরাসি নাগরিক এবং তার মা ও ভাইবোনদের বন্দি করে রাখা হয়েছে।
উদ্ধারের পর সিলভি পুলিশকে জানান, ২০০৩ সালে খাইবার পাখতুনখোয়ার এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। সে সময় তাঁরা দুজনই অস্ট্রেলিয়ায় থাকতেন, যেখানে তাঁর স্বামী অবৈধভাবে কাজ করতেন। সেখানে তাঁদের দুই সন্তানের জন্ম হয় এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত তাঁরা অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। এরপর তাঁরা খাইবার পাখতুনখোয়ায় চলে আসেন। ২০১৪ সালের পর থেকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে তাঁদের আর কোনো যোগাযোগ ছিল না।
ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, পরিবারটি একটি জরাজীর্ণ বাড়িতে বাস করছিল। পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শিশুটির গায়ে ছিল ছেঁড়াফাটা পোশাক। উদ্ধারের পর সিলভিকে একটি নারী থানায় নেওয়া হয়, যেখানে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায় যে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। এরপর ফ্রান্স দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তাঁদের পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সিলভি তাঁর সন্তানদের নিয়ে ফ্রান্সে ফিরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সিলভির জীবনের এই বিভীষিকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাড়িটির অবস্থা এবং শিশুদের পরিস্থিতি থেকেই স্পষ্ট যে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের মধ্যে বাস করছিল। সাক্ষাৎকারে সিলভি বলেন, সামান্য কারণেই তাঁর স্বামী তাঁকে ও সন্তানদের মারধর করতেন। তাঁকে কারও সঙ্গে দেখা করারও অনুমতি দেওয়া হতো না। বড় দুই সন্তান লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আর ছোট দুই সন্তানকে কখনোই স্কুলে ভর্তি করা হয়নি। তারা নিরক্ষরই থেকে গেছে। সিলভি ভাঙা ইংরেজি ও পশতু ভাষার মিশ্রণে এসব কথা জানান।
সিলভি ও তাঁর সন্তানরা শেষ পর্যন্ত পালাতে পেরেছেন, কারণ তিনি একজন ফরাসি নাগরিক এবং ফরাসি সরকার তাঁকে দেশ ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে সহায়তা করবে। কিন্তু পাকিস্তানের লাখো নারী একই ধরনের নির্যাতনের মধ্যে আটকে আছেন, যাঁদের যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই।
কয়েক সপ্তাহ আগেই আমি সিন্ধুর গুলান ভারো নামের এক নারীর কথা লিখেছিলাম। তিনিও স্বামীর নির্যাতনের শিকার ছিলেন। সাহায্যের আশায় তিনি একটি নারী থানায় ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর আগেই তাঁর পরিবার ‘সম্মান’-এর দোহাই দিয়ে তাঁকে স্বামীর কাছে ফিরে যেতে রাজি করায়। বাড়িতে ফেরার পর তাঁর স্বামী, পরিবারের সহযোগিতায়, তাঁকে হত্যা করেন। সিলভির মতো তাঁর পালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো বিদেশি দেশ ছিল না।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীদের নিজেদেরই ঘৃণা করতে শেখায়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে কখনো বিবাহিত ছিলেন এমন নারীদের ৩৪ শতাংশ স্বামীর হাতে শারীরিক, যৌন অথবা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এটি দেখায়, নারীর প্রতি সহিংসতা দেশটিতে কতটা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
গবেষক ফিজ্জা রাজা ও হেইলি পালসের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু পুরুষদের মধ্যেই নয়, বহু নারীও মনে করেন, কিছু পরিস্থিতিতে স্বামীর স্ত্রীকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য। কারণ তাঁরা ছোটবেলা থেকেই এমন এক পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ও সমাজে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে এই ধারণাকে স্বাভাবিক হিসেবে শেখানো হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, ৩৫ শতাংশ নারী এবং ২৫ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, স্ত্রীর স্বামীর অনুমতি ছাড়া বাইরে গেলে তাকে মারধর করা ন্যায্য। আবার ৩৭ শতাংশ নারী এবং প্রায় ২২ শতাংশ পুরুষের মতে, স্ত্রী যদি স্বামীর সঙ্গে তর্ক করেন, তাহলেও তাঁকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য।
এ ছাড়া, স্ত্রী যৌন সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করলে বা সন্তানদের যথাযথভাবে দেখাশোনা না করলে স্বামীর মারধরকে ৪৭ শতাংশ নারী এবং ৩৮ শতাংশ পুরুষ যৌক্তিক বলে মনে করেন।
গবেষকরা নারীদের মধ্যে এত বেশি সমর্থন দেখে বিস্মিত হন। তাই তাঁরা একা সাক্ষাৎকার দেওয়া নারীদের সঙ্গে পরিবারের সদস্য বা অন্য কারও উপস্থিতিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া নারীদের উত্তর আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, নারীরা যখন একান্ত ব্যক্তিগত পরিবেশে কথা বলতে পেরেছেন, তখন তাঁদের অনেক কম সংখ্যকই স্ত্রীকে মারধরকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
অর্থাৎ, পরিবারের অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে নারীরা সামাজিক চাপের কারণে এমন মত প্রকাশ করেছেন, যা হয়তো তাঁদের প্রকৃত বিশ্বাস নয়।
এটি দেখায়, পাকিস্তানে নারীরা পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থার নিয়ম মেনে চলার জন্য কতটা তীব্র চাপের মুখে থাকেন, এমনকি তা তাঁদের নিজেদের স্বার্থের বিরুদ্ধেও যায়। গোপনীয় পরিবেশে কথা বলতে পারা নারীরা অনেক বেশি সংখ্যায় বলেছেন, স্বামীর স্ত্রীকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী এই সহিংসতাকে বৈধ বলে মনে করেন। এ থেকেই বোঝা যায়, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীদের নিজেদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিতে শেখায়।
পাকিস্তানের বহু পুরুষ এখনো বিশ্বাস করেন, স্ত্রীকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য। ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও সময়ের সঙ্গে এই মানসিকতার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেনি।
ফরাসি নাগরিক সিলভির মতো ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে এলে স্পষ্ট হয়, গৃহস্থালি নির্যাতন কতটা ব্যাপক এবং কী ভয়াবহভাবে ভুক্তভোগীদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। শুধু এটুকুই কামনা করা যায়, পাকিস্তানে নীরবে নির্যাতন সহ্য করে বেঁচে থাকা লাখো নারীরও যেন একদিন মুক্তির কোনো পথ তৈরি হয়।
*সূত্র : ডন। লেখক রাফিয়া চৌধুরী সাংবিধানিক আইন ও রাজনৈতিক দর্শনের শিক্ষক।



