মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ধাক্কা: বাংলাদেশে দারিদ্র্যে পড়তে পারেন আরও ১২ লাখ মানুষ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার কারণে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারেন।
একই সঙ্গে বৈশ্বিকভাবে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইউনিসেফের এক নতুন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং এর ফলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। এতে শিশুদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকার আরও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ইউনিসেফের বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে। এর ফলে দেশে অতিরিক্ত প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারেন।
দাম বাড়ার কারণে অনেক পরিবারকে খাবারের পরিমাণ কমানো, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় স্থগিত রাখা কিংবা শিশুদের শিক্ষার খরচ কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে শিশু দারিদ্র্য
‘দ্য ইম্প্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউজহোল্ডস’ শীর্ষক বিশ্লেষণে ১৬৭টির বেশি দেশের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ছে, কমছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মূল্য শুধু ওই অঞ্চলের শিশুরা নয়, বিশ্বের বহু দূরের শিশুরাও দিচ্ছে।
তিনি বলেন, সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, এর প্রভাব তত গভীর হবে। নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার কেনা ও শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। যারা আগে থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, তাদের সংকট আরও বাড়ছে।
দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি
বিশ্লেষণে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক ধাক্কা হলে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে।
আর সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও ব্যাহত হলে অতিরিক্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে যে শিশু দারিদ্র্য সৃষ্টি হতে পারে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই হবে এশিয়া ও আফ্রিকায়। কারণ, এই দুই অঞ্চলে আগে থেকেই দারিদ্র্যের হার বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাবও সবচেয়ে বেশি পড়ে।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, সোমালিয়ায় সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এতে খাদ্য, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার ব্যয়ও বেড়েছে। ইথিওপিয়ায় ডিজেলের দাম বেড়েছে ৩১ শতাংশ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ বেড়েছে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ। অন্যদিকে নাইজেরিয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাদ্য ও যাতায়াতে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।
অর্জন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
ইউনিসেফ বলছে, সময়মতো কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ না নেওয়া হলে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অগ্রগতি পিছিয়ে যেতে পারে। এর ফলে আরও বেশি শিশু পর্যাপ্ত খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে।
সংস্থাটি সরকার, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতির সময়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
ক্যাথেরিন রাসেল বলেন, এই সংকট শিশুদের বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সংঘাত, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সম্মিলিত প্রভাবে লাখ লাখ শিশু আরও গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যাবে এবং বহু বছরের উন্নয়ন অর্জন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।






