সর্বাধিক বিক্রিত ১০ বইয়ের নয়টিতেই ‘নারী খুন’, কিন্তু কেন?

যুক্তরাজ্যের এ সপ্তাহের সর্বাধিক বিক্রীত পেপারব্যাক কথাসাহিত্যের ১০টি বইয়ের মধ্যে ৯টির গল্পে একটি বিষয় মিল রয়েছে। সেগুলোর প্রতিটিতেই অন্তত একজন নারীকে হত্যা করা হয়।
দ্য সানডে টাইমস-এর এ সপ্তাহের বেস্টসেলার তালিকায় থাকা বইগুলো হলো: দ্য সিক্রেট অব সিক্রেটস, দ্য ডিভোর্স, দ্য নেমস, দ্য ফ্যামিলি ফ্রেন্ড, দ্য উইডো, দ্য ইম্পসিবল ফরচুন, দ্য হলমার্কড ম্যান, মাই হাজব্যান্ডস ওয়াইফ এবং বোলিন ট্রেইটর।
ঐতিহাসিক উপন্যাস থেকে শুরু করে ডোমেস্টিক নোয়ার ও পুলিশি তদন্তভিত্তিক গল্প, নানা ধরনের ধারার বই হলেও সবগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অন্তত একজন নারীর মৃত্যু।
শুধু দ্য করেসপন্ডেন্ট ব্যতিক্রম। চিঠি লেখার শিল্পকে ঘিরে রচিত এই উপন্যাসে নারী হত্যার কোনো ঘটনা নেই।
বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আনেন লেখক ওয়েন্ডি জোন্স। ইনস্টাগ্রামে তিনি লিখেছেন, “যুক্তরাজ্যে এ সপ্তাহে মানুষ যে বইগুলো সবচেয়ে বেশি কিনেছে ও পড়েছে, তার ৮৪ শতাংশেই বিনোদনের জন্য একজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। আসলে কী ঘটছে?”
নতুন নয়, বহু পুরোনো সাহিত্যিক প্রবণতা
এখনকার জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে নারী হত্যাকেন্দ্রিক কাহিনির আধিক্য চোখে পড়লেও এটি নতুন কোনো প্রবণতা নয়। ড্যাফনি ডু মরিয়েরের গথিক সাসপেন্স থেকে শুরু করে গিলিয়ান ফ্লিনের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার পর্যন্ত, সাহিত্যে নিহত নারী বহুদিন ধরেই বহুল ব্যবহৃত একটি কাহিনি-উপাদান।
২০১২ সালে প্রকাশিত গিলিয়ান ফ্লিনের গন গার্ল বিপুল সাফল্য পাওয়ার পর নিহত বা বিপন্ন নারীকে কেন্দ্র করে লেখা থ্রিলার উপন্যাস প্রকাশনা শিল্পের সবচেয়ে লাভজনক ধারাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। এরপর প্রায় এক দশক ধরে প্রকাশকেরা পরবর্তী ‘গার্ল থ্রিলার’ খুঁজে বেড়িয়েছেন।
কেন বারবার একই গল্প?
তাহলে বাণিজ্যিক কথাসাহিত্য কেন বারবার একই ধরনের গল্পে ফিরে যায়?
সমালোচকদের মতে, বারবার নারীদের সহিংসতার শিকার হিসেবে উপস্থাপন করলে সমাজে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি থাকে। তবে এই ধারার একটি বৈপরীত্যও রয়েছে। এসব বইয়ের সবচেয়ে বড় পাঠকগোষ্ঠীও নারী। অনেকের মতে, বাস্তব জীবনের ভয় ও অনিশ্চয়তাকে মানসিকভাবে মোকাবিলা করার একটি উপায় হিসেবেই নারীরা এসব গল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন।
‘নারীদের লেখা অপরাধকাহিনি পড়াও এক ধরনের নারীবাদী কাজ’
অপরাধকাহিনির লেখক মেল ম্যাকগ্রাথের মতে, একসময় রেমন্ড চ্যান্ডলার বা মিকি স্পিলেইনের মতো পুরুষ লেখকেরা মূলত পুরুষ গোয়েন্দাদের নায়ক বানানোর জন্য নারী চরিত্রকে হত্যা করতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে।
তার ভাষায়, “নারীদের লেখা অপরাধকাহিনি পড়া এখনো শক্তিশালী এক ধরনের নারীবাদী কাজ।”
অপরাধসাহিত্যের লেখক ও সমালোচক লরা উইলসনের মতে, ডোমেস্টিক নোয়ার জনপ্রিয় হওয়ার কারণ এটি বাস্তব জীবনের ভয়কে প্রতিফলিত করে।
তিনি বলেন, “নারী হত্যার ঘটনায় দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হত্যাকারী তাদের পরিচিত কেউ, যেমন স্বামী, সঙ্গী বা পরিবারের সদস্য। বিপরীতে পুরুষরা তুলনামূলক বেশি নিহত হন অপরিচিত ব্যক্তির হাতে। শিল্পখাতের প্রায় সব জরিপই দেখায়, অপরাধভিত্তিক কথাসাহিত্যের প্রধান ক্রেতা নারী।”
‘মৃত নারী’ শতাব্দীপ্রাচীন বিক্রির কৌশল
ঔপন্যাসিক ডেনিস মিনা এই প্রবণতার শিকড় খুঁজে পান অষ্টাদশ শতকের লন্ডনের সংবাদপত্রে। সে সময় কল্পিত অপরাধের গল্প সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো, যদি ভুক্তভোগী হতেন নির্দিষ্ট ধরনের একজন নারী।
তিনি বলেন, “বিশেষ করে সুন্দরী, তরুণী, শ্বেতাঙ্গ এবং তথাকথিত নিষ্পাপ নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গল্প বিক্রি হয়ে আসছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।”
তবে তিনি এটিকে অশুভ প্রবণতা হিসেবে দেখেন না।
তার মতে, “পাঠকেরা হয়তো এমন চরিত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখতে চান না, বরং তাকে বাঁচাতে চান। গল্প তখনই এগোয়, যখন পাঠক সত্যিই জানতে চান ওই নারীর সঙ্গে কী ঘটেছিল।”
ভয় থেকে শেখার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধবিজ্ঞানী স্কট বন, হোয়াই উই লাভ সিরিয়াল কিলারস বইয়ের লেখক, একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার গবেষণায় বহু নারী জানিয়েছেন, তারা ট্রু-ক্রাইম পডকাস্ট ও তথ্যচিত্র শোনেন বা দেখেন, যাতে অপরিচিতের হামলা থেকে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করা যায় বা বিপজ্জনক মানুষের সতর্কসংকেত কীভাবে চেনা যায়, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
অপরাধকাহিনির লেখক লরি রাডার-ডের মতে, এই সাহিত্য উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য নয়, বরং মানসিক চাপ সামলানোর একটি মাধ্যম।
তিনি বলেন, “অপরাধভিত্তিক উপন্যাসই আমাদের সময়ের সামাজিক উপন্যাস। বাস্তবে সহিংস অপরাধ হয়তো ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, কিন্তু এসব গল্প আমাদের উদ্বেগকে নিরাপদ একটি জায়গায় নিয়ে যায়।”
তার মতে, বেশিরভাগ অপরাধকাহিনি ৪০০ পৃষ্ঠার আগেই রহস্যের সমাধান করে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। বাস্তব জীবনের মৃত্যু কখনোই এমন নয়। আর এ কারণেই পাঠকের কাছে এসব গল্প স্বস্তিদায়ক মনে হয়।
কেন নিহত নারী প্রায়ই একই রকম?
লরি রাডার-ডের মতে, এর পেছনে সাহিত্যিক কৌশল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সাংস্কৃতিক ধারণাও।
তিনি বলেন, “বেশিরভাগ পাঠকই নারী। তাই লেখক যদি তাদের উদ্বেগ তুলে ধরতে চান, তবে একজন নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করাই স্বাভাবিক।”
তবে নিহত নারী চরিত্রের চেহারা নিয়েও তার সমালোচনা রয়েছে।
তার ভাষায়, “সে সাধারণত সুন্দরী, রোগা, স্বর্ণকেশী বা লালচুলের। হয় তাকে নিষ্পাপ নারী, নয়তো যৌনকর্মী হিসেবে দেখানো হয়। এই ‘সুন্দর মৃত নারী’ আসলে একজন নিরপরাধ ভুক্তভোগীর প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়, অথচ তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরার প্রয়োজনই পড়ে না। এর পেছনে এখনো টিকে থাকা বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী সামাজিক বিশ্বাস বড় ভূমিকা রাখে।”
বিতর্কও কম নয়
সবাই অবশ্য এই ধারার পক্ষে নন।
লেখক ব্রিজেট ললেস চালু করেন স্টঞ্চ পুরস্কার, যেখানে এমন থ্রিলারকে পুরস্কৃত করা হয়, যাতে কোনো নারীকে মারধর, অনুসরণ, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ বা হত্যা করা হয়নি।
তবে অপরাধসাহিত্যের অনেক লেখকই এর বিরোধিতা করেন।
ভ্যাল ম্যাকডারমিড বলেন, “সহিংসতাকে অযথা মহিমান্বিত করা লেখকদের সঙ্গে আমাকে এক কাতারে দাঁড় করানোয় আমি আপত্তি জানাই।”
অন্যদিকে লেখক সারাহ হিলারি এই পুরস্কারকে “সবচেয়ে অনারীবাদী উদ্যোগগুলোর একটি” বলে মন্তব্য করেন।
অপরাধকাহিনির লেখক সোফি হান্নার মতে, সহিংসতাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়াই সমাধান নয়।
তার ভাষায়, “সহিংসতা করা আর সহিংসতা নিয়ে লেখা এক বিষয় নয়। মানুষ যদি মানুষকে নির্মমভাবে আঘাত করাই বন্ধ না করে, তাহলে সেই সহিংসতাকে সাহিত্যিকভাবে বিশ্লেষণ করা, তার নৈতিক বিচার করা এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা নিয়ে গল্প বলার প্রয়োজন রয়েছে।”
সূত্র: গার্ডিয়ান







