অনলাইনে হয়রানি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে কর্মস্থলে অভিযোগ করেছি: রিমানা

শামা সুলতানা
অনলাইনে হয়রানি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে কর্মস্থলে অভিযোগ করেছি: রিমানা
rimana

গত ৬ মে ফেসবুকে একটি পোস্ট করেন রিমানা আক্তার। তিনি লেখেন, “আমি না আজকে একটা দারুণ কাজ করেছি। মানে এত চমৎকার কাজ করছি যে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াতে মন চাচ্ছে। আমার প্রোফাইলে এসে যারা বুলিং–পার্সোনাল অ্যাটাক টাইপের কমেন্ট করে, এইরকম ১০ জনকে চুজ করছি। কারও আইডি লক ছিল, কারও পাবলিক। এরপর এদের ফেসবুক–ইনস্টাগ্রাম–লিংকডইন ঘেঁটে এদের ওয়ার্কপ্লেস–ইনস্টিটিউট খুঁজে বের করে স্ক্রিনশটসহ একদম ডিটেইলে ফরমাল মেইল করেছি অথরিটিকে।”

রিমানা কেন এমনটা করেছেন? তিনি জানালেন, অনলাইনে হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারীরা, কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও আছে। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খুঁজে তিনি সেটাই করেছেন। রিমানার সঙ্গে কথা বলেছে রোকেয়া কালেকটিভ।

১. প্রথম কখন বুঝলেন, এটা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং বড় সামাজিক সমস্যা?

রিমানা আক্তার: আমি যখন দেখলাম আমার একটা রিমাইন্ডার পোস্ট থেকে হাজার হাজার কুরুচিপূর্ণ কমেন্ট আসা শুরু হলো এবং মানুষ আমাকে ‘শাহবাগী’ বা ‘নারীবাদী’র মতো ট্যাগ দিয়ে আক্রমণ করছে, তখনই বুঝলাম এটা আসলে একটা গভীর সামাজিক সমস্যা। এছাড়া আমরা মেয়েরা অনেকেই ছোটবেলায় পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে বা আত্মীয়দের দ্বারা অ্যাবিউজের শিকার হয়েছি। সেখান থেকে শুরু করে পয়লা বৈশাখে টিএসসিতে নারী লাঞ্ছনার ঘটনাগুলো আমাকে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে যে নারীদের প্রতি এই অসম্মান আমাদের সমাজের গভীরে রয়ে গেছে।

২. পোস্টটি পাবলিক করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ কী ছিল?

রিমানা আক্তার: আমি আমার ফেসবুক প্রোফাইলকে মূলত একটা ‘ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন’ বা আর্কাইভ হিসেবে দেখি। আমি চেয়েছি এই নোংরা মানসিকতাগুলোকে পাবলিকলি রেকর্ড করতে। আমার উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টিকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক না রেখে বিষয়-কেন্দ্রিক করা, যাতে অন্য মেয়েরাও পরিস্থিতিটা বুঝতে পারে এবং সচেতন হয়।

৩. পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর অনলাইন ও অফলাইন প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

রিমানা আক্তার: অনলাইনে আমাকে নিয়ে জঘন্য ট্রল হয়েছে, ‘গায়ে গন্ধ’র মতো ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে। অফলাইনে আমার স্বামী, পরিবার এবং আমার চরিত্র নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করা হয়েছে। এমনকি সরাসরি যৌন লালসা প্রকাশ করে ইনবক্সে মেসেজও এসেছে। অবাক করার বিষয় হলো, তথাকথিত ‘লিবারেল’ বা মুক্তমনা মানুষরাও আমাকে গালিগালাজ করতে পিছপা হয়নি।

৪. ব্যক্তিগত জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্য কতটা প্রভাবিত হয়েছে?

রিমানা আক্তার: মানসিকভাবে এটা সামলানো বেশ কঠিন ছিল। তাই আমি এখন একটি সতর্কতা নিই—যেকোনো পোস্টের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর আমি কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে দিই। ইনবক্সে নোংরা মেসেজ আসা ঠেকাতে মেসেজ রিকোয়েস্ট অপশন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছি। আমি মনে করি, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া বা না নেওয়ার চেয়েও নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি।

৫. বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানিকে কি গুরুত্ব দেওয়া হয়?

রিমানা আক্তার: একদমই না। আমাদের দেশে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট নিয়ে মানুষের কোনো ভয় নেই। উন্নত বিশ্বে মানুষ অনলাইনে কিছু করার আগে দশবার ভাবে, কারণ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আছে। কিন্তু এখানে মানুষ সাইবার অপরাধকে হালকাভাবে নেয়, কারণ এর কোনো জবাবদিহি নেই।

৬. ভিকটিম ব্লেমিং ও পাবলিক স্ক্রুটিনি কতটা ক্ষতিকর?

রিমানা আক্তার: এটা মারাত্মক। যখন অনলাইন পোর্টালগুলো নিউজ করে—‘ফেসবুকে কমেন্ট করার জন্য চাকরি হারাল’, তখন তারা মূল অপরাধ বা সাইবার বুলিংকে আড়াল করে ফেলে। এতে অপরাধীর বদলে উল্টো ভিকটিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

৭. আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?

রিমানা আক্তার: আমি সোশ্যাল মিডিয়া বা আইনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সেফগার্ডিং পলিসির ওপর বেশি ভরসা করেছি। অভিযুক্তদের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে আমি তাদের কর্মস্থলে অভিযোগ করেছি। ১০টির মধ্যে ছয়টি অভিযোগের ফিরতি মেইল পাওয়া এবং বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিটিং করতে পারাটা আমাকে কিছুটা হলেও আশা দিয়েছে যে প্রফেশনালি বিষয়টি হ্যান্ডেল করলে ফল পাওয়া যায়।

৮. মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা নিয়ে আপনার অবস্থান কী?

রিমানা আক্তার: মিডিয়া অনেক সময় শুধু টিআরপির জন্য ভিকটিমকে ব্যবহার করে। তারা শিরোনামে মূল ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে যায়। এ কারণেই আমি যত্রতত্র ইন্টারভিউ দিই না; শুধু যারা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করে নিউজ করে, তাদের সঙ্গেই কথা বলি।

৯. জাস্টিস ও ডিজিটাল সেফটি নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলেছে?

রিমানা আক্তার: আগে হয়তো আমি গালিগালাজ দেখে কিছুটা হীনমন্যতায় ভুগতাম। এখন আমি জানি কীভাবে ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাক করে অপরাধীদের জবাবদিহির মধ্যে আনা যায়। আমি বুঝেছি, প্রতিবাদটা ব্যক্তি থেকে বিষয়ভিত্তিক পর্যায়ে নেওয়া জরুরি।

১০. যারা চুপ করে আছে, তাদের জন্য আপনার বার্তা কী?

রিমানা আক্তার: আমার বার্তা হলো, চুপ থাকা যাবে না। বাংলাদেশে ‘হেল্প-সিকিং প্র্যাকটিস’ নেই বলেই অপরাধীরা বারবার সুযোগ পায়। এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেভাবে বড় প্রচারণা হয়েছিল, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধেও তেমন প্রচার দরকার। নিজের মানসিক শান্তি বজায় রেখেও প্রতিবাদ করা সম্ভব—এটা আমাদের বুঝতে হবে।

১১. ভবিষ্যতে যদি একই ঘটনার শিকার হন, প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?

রিমানা আক্তার: আমার প্রতিক্রিয়া একই থাকবে। আমি একইভাবে পদক্ষেপ নেব এবং আরও দৃঢ়ভাবে এগোবো।