ফেসবুকের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক বাকস্বাধীনতা - হেইটস্পিচ কি?

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
ফেসবুকের মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক বাকস্বাধীনতা - হেইটস্পিচ কি?
ছবি: রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

আলোচিত-সমালোচিত অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে করা মন্তব্যে গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক পক্ষের যুক্তি ছিল, তিনি অভ্যুত্থানকে খাটো করেছেন। তাঁরা জনরোষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে প্রায় কাছাকাছি মন্তব্য করেন। কেউ কেউ আবার এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ১৯৭১ নিয়েও বিরূপ মন্তব্য করেছেন।

অন্য পক্ষ তাঁকে বাহবা দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে, যদি ‘সিডিআই’ একটি খারাপ শব্দ হয়, তাহলে হালের তরুণদের মুখে মুখে ফেরা ‘টেনে ছিঁড়ে ফেলা’ বা ‘কেটে ফেলা’ ধরনের বক্তব্যকে কী বলা হবে? একটি যদি বাকস্বাধীনতার আওতায় পড়ে, তাহলে অন্যটি কেন হেইট স্পিচ?

বাংলাদেশের আইনে বাকস্বাধীনতা ও হেইট স্পিচ সম্পর্কে কী বলা আছে, তা জানতে রোকেয়া কালেকটিভ কথা বলেছে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর উপদেষ্টা প্রিয়া আহসান চৌধুরীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাহমিদা নাসরিন।

রোকেয়া কালেকটিভ: বাকস্বাধীনতা কী? এর সীমা কতটুকু?

প্রিয়া আহসান চৌধুরী: বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে নিঃশর্তভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে আইনের মাধ্যমে কিছু যুক্তিসংগত বাধা-নিষেধ (reasonable restrictions) আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এসব সীমাবদ্ধতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি অথবা অপরাধে উসকানি প্রতিরোধের স্বার্থে আরোপ করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা দেয়।

তবে এ স্বাধীনতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যাবে তখনই, যখন সেই সীমাবদ্ধতা সত্যিই প্রয়োজনীয় হবে। সেটি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা আইনে নির্ধারিত, বৈধ উদ্দেশ্য (legitimate aim) পূরণে প্রয়োজনীয় এবং সেই উদ্দেশ্যের তুলনায় প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক (necessary and proportionate) হবে।

এ ছাড়া ICCPR-এর ২০ অনুচ্ছেদে জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি দেয় এমন বক্তব্য এবং যুদ্ধের প্রচারণা নিষিদ্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

রোকেয়া কালেকটিভ: বাকস্বাধীনতাকে আসলে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

প্রিয়া আহসান চৌধুরী: Handyside v United Kingdom মামলায় European Court of Human Rights ১৯৭৬ সালে রায় দেন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জনপ্রিয় বা গ্রহণযোগ্য মতামতকেই নয়, বরং এমন মতামতকেও সুরক্ষা দেয়, যা ‘আঘাত করে, বিস্মিত করে বা বিরক্তির সৃষ্টি করে’—যতক্ষণ না তা আইনবিরোধী উসকানি বা আইনে স্বীকৃত অন্য কোনো বৈধ সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়ে।

রোকেয়া কালেকটিভ: হেইট স্পিচ (Hate Speech) বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন আছে কি?

প্রিয়া আহসান চৌধুরী: বাংলাদেশে ‘হেইট স্পিচ’ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কোনো একক ও পূর্ণাঙ্গ আইনগত সংজ্ঞা নেই। আন্তর্জাতিক আইনেও এমন কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। তবে বিভিন্ন আইনে নির্দিষ্ট ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৬ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি হ্যাকিং বা অন্য কোনো অবৈধ উপায়ে সাইবার স্পেসে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক উপাদান ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ বা প্রচার করেন এবং এর ফলে সহিংসতা বা ভীতির সৃষ্টি হয়, অথবা বিশৃঙ্খলা বা অপরাধে উসকানি তৈরি হয়, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৫৩এ ধারায় বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিকের মধ্যে শত্রুতা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি বা তা উসকে দেওয়া অপরাধ। তবে বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য ছাড়া সৎ বিশ্বাসে (good faith) করা সমালোচনা এই ধারার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারায় ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্যে কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া অপরাধ। তবে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ব্যবহৃত ‘হেইট স্পিচ’-এর ধারণা থেকে আলাদা।

কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয় বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানিকে; আর ২৯৫এ ধারা মূলত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে।

এসব অপরাধের বিচার সাধারণ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই হয়। বাংলাদেশে হেইট স্পিচের জন্য কোনো পৃথক ট্রাইব্যুনাল বা বিশেষ আদালত নেই।

রোকেয়া কালেকটিভ: হেইট স্পিচ ও মানহানি কি একই বিষয়?

প্রিয়া আহসান চৌধুরী: না। হেইট স্পিচ এবং মানহানি দুটি ভিন্ন আইনগত ধারণা।

মানহানি (Defamation) হলো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করা।

অন্যদিকে হেইট স্পিচ সাধারণত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তাদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, যৌন অভিমুখিতা বা অন্য কোনো সুরক্ষিত পরিচয়ের কারণে লক্ষ্যবস্তু করে এবং বৈষম্য, শত্রুতা বা সহিংসতায় উসকানি দেয়। ফলে হেইট স্পিচকে কেবল মানহানির একটি রূপ হিসেবে দেখা যায় না।

সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৬ ধারা, দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারা এবং কিছু ক্ষেত্রে ১৫৩এ ধারা মূল্যায়ন করা হয় ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদ (মতপ্রকাশের স্বাধীনতা) এবং ২০ অনুচ্ছেদের (বিদ্বেষমূলক উসকানি নিষিদ্ধকরণ) আলোকে।

সমালোচকেরা প্রায়ই বলেন, ‘বিদ্বেষ’, ‘ভীতি’, ‘বিশৃঙ্খলা’ বা ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’—এসব শব্দের সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নেই। ফলে এগুলোর ব্যাখ্যা অনেকাংশেই ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যেতে পারে।

এতে আইন প্রয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং কখনো কখনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডে যে সংকীর্ণ অর্থে ‘উসকানি’কে সীমিত করা হয়েছে, তার বাইরেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

এটি বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এবং ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

দণ্ডবিধির ২৯৫এ ধারা দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে রয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। একইভাবে, তুলনামূলকভাবে নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২৬ ধারা নিয়েও ইতিমধ্যে এর অপব্যবহারের অভিযোগ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

রোকেয়া কালেকটিভ: ‘শালীনতা’ (Decency) ও ‘নৈতিকতা’ (Morality)-এর কোনো আইনগত সংজ্ঞা আছে কি?

প্রিয়া আহসান চৌধুরী: না, নেই। বাংলাদেশের আইনে ‘শালীনতা’ বা ‘নৈতিকতা’র কোনো সুস্পষ্ট আইনগত সংজ্ঞা নেই। তবে সংবিধান অনুযায়ী, বাকস্বাধীনতার ওপর যেকোনো বিধিনিষেধ অবশ্যই আইনের মাধ্যমে আরোপ করতে হবে।

আমার জানা মতে, শালীনতার ভিত্তিতে মতপ্রকাশ সীমিত করার মতো কোনো নির্দিষ্ট আইনও নেই। তবে দণ্ডবিধি ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে ‘অশ্লীল’ (obscene) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু ‘অশ্লীল’ শব্দটিরও কোনো আইনগত সংজ্ঞা নেই। ফলে এর ব্যাখ্যা অনেকাংশেই ব্যক্তিনির্ভর হয়ে যেতে পারে।

সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়া তৈরির সময় আমরা ‘অশ্লীল’ শব্দটি না রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ওই আইনে শব্দটি রাখা হয়নি। এটি ইতিবাচক, কারণ ‘অশ্লীল’ একটি অস্পষ্ট ও সমস্যাজনক শব্দ, যার ব্যাখ্যা সহজেই ভিন্ন ভিন্নভাবে করা সম্ভব।