বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের চিরবিদায়

বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিত্রশিল্পী এবং বাংলাদেশের পাপেটশিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা নিয়ে গত ১৪ জুন থেকে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পর তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণে নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য মুস্তাফা মনোয়ার বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর সৃষ্ট জনপ্রিয় পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ একসময় শিশু-কিশোরদের কাছে যেমন জনপ্রিয় ছিল, তেমনি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুনের সন্তান।
নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। পরে কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে (বর্তমান গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট) ভর্তি হয়ে ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
দেশে ফিরে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শে আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে শিক্ষকতা ছেড়ে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে যোগ দেন। ভারতেই পাপেটশিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহের সূচনা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (এফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।
চিত্রকলা, টেলিভিশন, শিশুতোষ বিনোদন ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন। এছাড়াও দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহকর্মী, শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁকে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণ করছেন।






