শ্রাবণের রোদন: বৃষ্টির দিনে বৈপরীত্যের ঢাকা

সাওমী রহমান নাবা
শ্রাবণের রোদন: বৃষ্টির দিনে 
বৈপরীত্যের ঢাকা
বিকেলে দোকান খুললেও রাস্তার পাশে অবস্থান হওয়ায় অনেক ক্রেতার চোখেই পড়ছে না শিল্পীর চায়ের দোকান | ছবি: সাওমী রহমান নাবা

ঢাকার ৬০ ফিট এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন একজন রিকশাচালক। বৃষ্টি তাকে সকাল থেকে গৃহবন্দী করে রেখেছিল। সারা সকাল রিকশা নিয়ে বের হতে না পারায় উপার্জনের পথ ছিল পুরোপুরি বন্ধ। ছুটির দিন হওয়ায় বিকেলে যখন বৃষ্টি একটু কমল, মানুষ তখন বাইরে বেরিয়েছে ঘোরাঘুরির জন্য। ফরিদ উদ্দিন আশা করেছিলেন, কিছুটা আয় হবে।

কিন্তু সকালের সেই লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ আর হলো না। দিনশেষে তার মলিন মুখই বলে দিচ্ছিল, বৃষ্টির এই বিরাম তার জীবনে বড় কোনো স্বস্তি বয়ে আনেনি।

টানা কয়েক দিনের বর্ষণে ঢাকা শহর এক অদ্ভুত দ্বিমুখী রূপ ধারণ করেছে। আকাশের অঝোর ধারা কারও জন্য নিয়ে এসেছে ছুটির দিনের আলস্য আর আয়েশের সুযোগ, আবার কারও জন্য এই বৃষ্টিই হয়ে দাঁড়িয়েছে জীবন-জীবিকার সবচেয়ে বড় বাধা।

প্রকৃতির এই রূপ একই সঙ্গে রোমান্টিক এবং নিষ্ঠুর। একদল মানুষ ঘরে বসে গরম খিচুড়ির ধোঁয়ায় সুখ খুঁজে নিচ্ছেন, ঠিক তার উল্টো দিকে আরেক দল মানুষ নিরুপায় হয়ে নেমেছেন বৃষ্টির তীব্রতার সঙ্গে লড়াইয়ে।

সন্ধ্যার পর যখন বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে আসে, তখন স্থানীয় চায়ের দোকানগুলোতে জমে ওঠে আড্ডার আসর। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা বাড়ির রান্নাঘরে খিচুড়ি রান্নার ঘ্রাণ, বৃষ্টির এই রূপটি অনেকের কাছেই পরম উপভোগ্য। বিশেষত শিক্ষার্থীদের জন্য। বাসায় বসেই অনেকে পার করছেন অবসর সময়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফি বলেন, “ভেবেছিলাম একটু বের হব। বৃষ্টির জন্য পরিকল্পনা বাতিল করতে হলো। তবে বাসায় বই পড়ে, পছন্দের সিরিজ দেখে এবং পরিবারের সবার জন্য রান্না করে সময় পার করছি। ভালোই লাগছে।”

আরেকজন স্কুলশিক্ষার্থী নাবিল বলেন, “বৃষ্টি হচ্ছে, ভালোই হচ্ছে। আরাম করে ঘুমাচ্ছি। ঘুম থেকে উঠে গেম খেলতে বসছি।”

তবে এই আয়েশের আড়ালের বাস্তবতা বড়ই নির্মম।

সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে চরম বিরক্তি ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার এই বেহাল অবস্থার কারণে একটু বৃষ্টি হলেই সড়কগুলোতে পানি জমে যায়, যা যাতায়াতব্যবস্থাকে করে তোলে প্রায় স্থবির।

এই ভোগান্তির মধ্যেও ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে বিকেলে একটু বাইরে বের হয়েছেন। কিন্তু জলাবদ্ধ রাস্তায় হাঁটুপানি মাড়িয়ে তাদের উৎসবের আমেজ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে।

মিরপুরের হোপ মার্কেটের সামনে ভ্যানে করে জুতা বিক্রি করেন মোহাম্মদ জিয়াদ। পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। বৃষ্টির কারণে তার ভ্যানের নতুন জুতাগুলোতে কাদা ছিটে একাকার। জিয়াদ বলেন, “বৃষ্টি কমলে বিকেলে দোকান খুলতে হয়েছে। আজ সারা সকাল বসিনি। স্থায়ী বসার জায়গা না থাকায় বারবার জায়গা পরিবর্তন করতে হচ্ছে। গত কয়েক দিন কখনো পলিথিন দিয়ে জুতা ঢেকে রাখি, আবার খুলে দিই। কখনো বৃষ্টির মধ্যেই খোলা রেখে দিই, আর উপায় থাকে না।”

জিয়াদদের কাছে বৃষ্টি মানে কেবল ভিজে যাওয়া নয়, বরং বিনিয়োগ করা পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখার এক নিরন্তর সংগ্রাম।

অন্যদিকে, রাস্তার পাশে ছোট একটি চায়ের দোকান নিয়ে বসেছেন শিল্পী। সঙ্গে রয়েছে তার ছেলে। বিকেলে দোকান খুললেও রাস্তার পাশে অবস্থান হওয়ায় অনেক ক্রেতার চোখেই পড়ছে না তাদের দোকান। শিল্পীর ছেলের কণ্ঠে ধরা পড়ে এক করুণ বাস্তবতা। সে বলে, “কেউ আসে না দোকানে। আম্মার চাও বিক্রি হয় না। বৃষ্টি আর ভালো লাগে না।”

বৃষ্টির এই রোমান্টিক আবহ তাদের জন্য কোনো সুখস্মৃতি নিয়ে আসেনি; বরং নিয়ে এসেছে এক বুক দুশ্চিন্তা।

শহরের খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর এবং ভাসমান দোকানদারেরা এই বৃষ্টির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। বৃষ্টির কাব্যিক ছন্দের নিচে চাপা পড়ে যায় তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। কর্মব্যস্ত এই নগরীর আড়ালে এটাই যেন এক নিত্যদিনের বাস্তবতা।