টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বিপর্যস্ত ১১ লাখ মানুষ, সবচেয়ে ঝুঁকিতে নারী, শিশু ও রোহিঙ্গারা

টানা বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা ঢল, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে নতুন করে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ১১ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ গেছে ৫৩ জনের, আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বা নিরাপদ স্থানে যেতে বাধ্য হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম। একই সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতেও বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে বসবাস করায় সেখানে বসবাসরত মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে।
অক্সফাম জানায়, দুর্যোগে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার মানুষ ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গৃহস্থালি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক পরিবার খাদ্য, বিছানাপত্র ও রান্নার সরঞ্জাম হারিয়েছে। পানিবন্দী অনেক এলাকায় এখনো মানুষ নিরাপদ খাবার পানি পাচ্ছে না। শুকনো জায়গা ও জ্বালানির অভাবে অনেক পরিবার রান্নাও করতে পারছে না।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, “পানি এত দ্রুত উঠেছিল যে কিছুই বাঁচাতে পারিনি। খাবার, বিছানাপত্র, রান্নার জিনিসপত্র সব নষ্ট হয়ে গেছে। বিশুদ্ধ পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাদ্য, নিরাপদ পানি এবং ঘর মেরামতের সহায়তা।”
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষ
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন নারী, কিশোরী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং নারীপ্রধান পরিবারের সদস্যরা। নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব, নিরাপদ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ তাঁদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতে এ পর্যন্ত ১৬৪টি পাহাড়ধস ও ৪২টি বন্যার ঘটনা ঘটেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন স্থাপনা ধসে ১৫ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জনকে অস্থায়ীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ। বন্যার পানিতে টয়লেট ও পানির উৎস তলিয়ে যাওয়ায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন বড় সংকট
দুর্যোগে অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি পানির উৎস এবং ১২ হাজার ৪০০টি টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে নিরাপদ খাবার পানির সংকটের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য, অস্থায়ী আশ্রয়, স্বাস্থ্যবিধি-সামগ্রী, স্যানিটেশন সুবিধা এবং নগদ সহায়তা।
সহায়তা কার্যক্রম শুরু
দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে। অক্সফাম জানিয়েছে, স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি খাদ্য, নিরাপদ খাবার পানি, স্বাস্থ্যবিধি ও ডিগনিটি কিট এবং বহুমুখী নগদ সহায়তা দেবে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা দেওয়া হবে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত জেন্ডার-সংবেদনশীল এ মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা।






