‘জাতীয় সংকটে সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে প্রবাসীরা, নতুন সংযোগ গড়বে ব্রিজ টু বাংলাদেশ’

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
‘জাতীয় সংকটে সবসময় বাংলাদেশের পাশে থেকেছে প্রবাসীরা, নতুন সংযোগ গড়বে ব্রিজ টু বাংলাদেশ’
রোববার ঢাকায় অক্সফাম আয়োজিত অনুষ্ঠানে ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ব্রিজ টু বাংলাদেশ’ উদ্বোধন করা হয়।

জাতীয় সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক বিপর্যয় কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশের পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের এমপি ও অল-পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ অন বাংলাদেশের চেয়ারপারসন আপসানা বেগম। তাঁর মতে, নতুন চালু হওয়া ‘ব্রিজ টু বাংলাদেশ’ প্ল্যাটফর্মটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি কার্যকর পথ তৈরি করবে।

রোববার ঢাকায় অক্সফাম আয়োজিত অনুষ্ঠানে ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘ব্রিজ টু বাংলাদেশ’ উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আপসানা বেগম এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, “জাতীয় সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাংলাদেশি প্রবাসীরা দেশের পাশে থেকেছেন।”

আপসানা বেগম বলেন, তাঁর মতো অনেক ব্রিটিশ-বাংলাদেশি, যারা যুক্তরাজ্যে জন্মেছেন ও বেড়ে উঠেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণে অবদান রাখতে চান। কিন্তু সেই আগ্রহকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য সংযোগের প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আজ চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি সে সুযোগ তৈরি করবে। ‘ব্রিজ টু বাংলাদেশ’ সেই সংযোগের কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।”

বাংলাদেশে অক্সফামের উদ্যোগে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত ২৪ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী যাচাইকৃত বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জ্ঞান, মেন্টরশিপ, দক্ষতা, অ্যাডভোকেসি, উদ্ভাবন, দাতব্য উদ্যোগ, বিনিয়োগ সংযোগ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী। তবে সেই সম্পৃক্ততা বাড়াতে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তিনি জানান, সরকারের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ডায়াসপোরা নীতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই তা অনুমোদন পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও আস্থার ঘাটতি এবং সরকারি সেবা পাওয়ার জটিলতার কারণে পিছিয়ে যান। এ জন্য সরকারি সেবায় সংস্কার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনের কার্যকর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোখতার আহমেদ বলেন, এই উদ্যোগ সরকারের ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার প্রচেষ্টাকে আরও শক্তিশালী করবে।

তিনি বলেন, “একবার এই সংযোগটি কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে এটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।”

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশে অক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর আশীষ দামলে বলেন, এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি যৌথ জাতীয় উদ্যোগ। তাঁর মতে, এই প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের বৈশ্বিক পরিচয়কে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারে, যেখানে বাংলাদেশ শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নয়, বরং জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবনের অবদানকারী দেশ হিসেবেও পরিচিত হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) প্রধান ড. লরা টম-বন্ডে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সাবুর খান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স তুনিওন এবং অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং প্রবাসী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অক্সফাম জানায়, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরের গবেষণার ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। ১২টি দেশে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর জরিপ, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিশ্বের ১১টি ডায়াসপোরা প্ল্যাটফর্মের বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে এর কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে যাচাইকৃত ব্যবহারকারী প্রোফাইল, স্মার্ট ম্যাচমেকিং, মেন্টরশিপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং অবদানের প্রভাব পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা। প্রবাসী বাংলাদেশি, দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগে অংশ নিতে পারবেন।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর বাইরে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ককে দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করাই ‘ব্রিজ টু বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।