সার্ক ও বিমসটেক একে অপরের বিকল্প নয়, পরিপূরক: শামা ওবায়েদ

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
সার্ক ও বিমসটেক একে অপরের বিকল্প নয়, পরিপূরক: শামা ওবায়েদ
অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউয়িং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য সার্ক (সার্ক) ও বিমসটেকের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। তাঁর মতে, দুটি আঞ্চলিক জোট একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক।

সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউয়িং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

শামা ওবায়েদ বলেন, বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়াকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত করে। অন্যদিকে সার্ক দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে এমন সদস্য দেশও রয়েছে, যারা বিমসটেকের অংশ নয়।

শামা ওবায়েদ বলেন, উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলো যেন সার্ককে দুর্বল না করে। বরং এগুলো বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একই সঙ্গে সার্ক ও বিমসটেককে এগিয়ে নিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংযোগ, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুটি জোটই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শামা ওবায়েদ বলেন, সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রথম ধাপে বাংলাদেশ চায়, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটি ‘সর্বোচ্চ কার্যকর’ অবস্থায় পরিচালিত হোক।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর অর্থ শুধু নামমাত্র সার্ককে টিকিয়ে রাখা নয়; বরং বর্তমান বাস্তবতায় যতটা সম্ভব কার্যকরভাবে সংস্থাটিকে সচল রাখা। এর মধ্যে থাকবে নিয়মিত কারিগরি ও কর্মকর্তাদের বৈঠক, নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদার এবং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফল নিশ্চিত করা।

শামা বলেন, সব সদস্য রাষ্ট্র একসঙ্গে কোনো উদ্যোগে অংশ নিতে প্রস্তুত না থাকলেও, যারা প্রস্তুত তারা এগিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অন্য সদস্যদের জন্যও অংশগ্রহণের সুযোগ খোলা রাখতে হবে।

দ্বিপক্ষীয় বিরোধ যেন বাধা না হয়

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার্কের লক্ষ্য কোনো দুটি দেশকে রাজনৈতিক সংলাপে বাধ্য করা নয়। বরং দ্বিপক্ষীয় বিরোধ যেন পুরো আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অচল করে না দেয়, সেটিই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সার্ক এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলো সম্মিলিতভাবে নিজেদের মত তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে ভারত গঠনমূলক আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রদর্শনের সুযোগ পায়, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও অভিন্ন সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।

শামা ওবায়েদ বলেন, সার্ক নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আশাবাদী, তবে বাস্তববাদীও।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি না, সার্ক রাতারাতি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। আবার এটাও মনে করি না যে কিছুই করার নেই। বাস্তবসম্মত, কারিগরি ও জনমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক কিছুই করা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, এখন প্রয়োজন সার্ককে টিকিয়ে রাখা, কার্যকর অংশগুলোকে আরও শক্তিশালী করা, দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা এবং যেখানে ঐকমত্য সম্ভব, সেখানে সহযোগিতা বাড়ানো।

মানচিত্র নিয়ে ভারতের আপত্তি

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজের উপদেষ্টা এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়া স্টাডিজের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো তারিক এ. করিম।

উপস্থাপনার সময় ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা প্রদর্শিত একটি মানচিত্র নিয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, মানচিত্রে জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সঠিকভাবে দেখানো হয়নি।

জবাবে তারিক এ. করিম বলেন, মানচিত্রটি কেবল উপস্থাপনার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, এটি প্রকৃত সীমান্তের প্রতিফলন নয়।

পরে পূজা কুমারী ঝা বলেন, তিনি শুধু বিষয়টি নজরে আনতে চেয়েছেন। জবাবে তারিক করিম বলেন, বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে।

আলোচনায় তারিক এ. করিম বলেন, সার্কের কাঠামো থাকলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সেটি কার্যকর হবে না।

তিনি বলেন, ‘একটি গাড়ির ইঞ্জিন থাকলেই হয় না। সেটি চালু করার মতো রাজনীতি থাকতে হবে। আবার চলতে হলে জ্বালানিও প্রয়োজন।’

তাঁর মতে, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে দুটি বিষয় অপরিহার্য। প্রথমত, রাজনৈতিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে যেতে হবে, যাতে সহযোগিতা বাধাগ্রস্ত না হয়। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবে এগিয়ে নেওয়া যায়।

সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার কর্মকর্তা, বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যমকর্মী ও নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।