বৃষ্টির বিকেলে যে মাদ্রাসা হয়ে উঠল মৃত্যুফাঁদ

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
বৃষ্টির বিকেলে যে মাদ্রাসা হয়ে উঠল মৃত্যুফাঁদ
9ef27ea9-7292-4907-8058-2fb81a1e2774

বুধবারের বিকেলটা ছিল অন্য দিনের মতোই। উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ/৩ ব্লকের ‘খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানা’য় চলছিল নিয়মিত ক্লাস। বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ছোট্ট মাদ্রাসাটিতে তখন উপস্থিত ছিল প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী। কেউ কোরআন পড়ছিল, কেউ শিক্ষকের পাঠ শুনছিল।

তারপরই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় সবকিছু।

কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে পড়েছিল। মাদ্রাসার উত্তর পাশে নির্মিত বড় একটি প্রতিরক্ষা দেয়াল মাটির চাপ আর ধরে রাখতে পারেনি। বিকেলের কোনো এক সময় দেয়ালটি ধসে পড়ে সরাসরি মাদ্রাসার টিনের ছাদের ওপর। মুহূর্তেই ভেঙে যায় ছাদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

আতঙ্কে চারদিকে ছুটোছুটি শুরু হয়। অনেকে দ্রুত বের হতে পারলেও কয়েকজন আটকা পড়েন দেয়াল, মাটি ও ছাদের ভারী অংশের নিচে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধারকাজ শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আটজনকে আর বাঁচানো যায়নি।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন একজন শিক্ষক ও সাত নারী শিক্ষার্থী।

স্থানীয় বাসিন্দা নূর কবির জানান, ঘটনাস্থলেই একজন শিক্ষক ও তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরও চার শিক্ষার্থী মারা যায়।

ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় নিহত আটজনের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষার্থীর পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তারা হলেন ক্যাম্প-৩-এর এফ-১ ব্লকের আবদু শুক্কুরের দুই মেয়ে উম্মে সালমা (১২) ও উম্মে নাজাত (১৩), একই ক্যাম্পের জি-৮৩ ব্লকের শামসু আলমের মেয়ে শাহিদা (১৩), ক্যাম্প-৫-এর এ-৮ ব্লকের মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে ওনাইসা বিবি (১৩) এবং এ-১১ ব্লকের হাশিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা (১৬)। আহত আরও অনেক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দুর্যোগ শুধু প্রকৃতির নয়

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী মানুষের কাছে বর্ষা মানেই নতুন আশঙ্কা। পাহাড় কেটে তৈরি করা বসতিগুলোর নরম ও বালুময় মাটি অতিবৃষ্টিতে আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ভূমিধস, দেয়াল ধস, জলাবদ্ধতা ও ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা প্রায় প্রতি বছরই ঘটে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক দিনের রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও একের পর এক ভূমিধস পাহাড়ের মাটিকে আরও আলগা করে দেয়। তবে এই দুর্ঘটনার পর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, প্রতিরক্ষা দেয়াল ও অন্যান্য অবকাঠামোর নির্মাণমান এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

গত রোববার ও সোমবার পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজনের মৃত্যুর পর বুধবারের এই নতুন ট্র্যাজেডি ক্যাম্পজুড়ে শোক ও আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

এই প্রাণহানির পর সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে গভীর শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, লাখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরক্ষা দেয়াল ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো দ্রুত সংস্কার কিংবা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।

একই সঙ্গে তারা দাবি জানিয়েছেন, মাদ্রাসা ভবন বা প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বাড়ছে ভূমিধস, কমছে সহায়তা

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত ৪ জুলাই থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে নতুন করে এক হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

সংস্থাটি জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে অতিরিক্ত জায়গা প্রয়োজন। কিন্তু সেই সুযোগ সীমিত। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের মাত্র ৪০ শতাংশের সংস্থান হয়েছে।

এই অর্থসংকটের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো মেরামত, নিরাপদ আশ্রয় তৈরি, জরুরি সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।

কাজের সুযোগ নেই, ঝুঁকি থেকে বাঁচার পথও সংকুচিত

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করার সুযোগ পান না। ফলে তাদের জীবিকা পুরোপুরি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। নিজেরা আয় করে ঘর মেরামত, নিরাপদ আশ্রয় নির্মাণ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও তাদের নেই।