শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্মরণে

তিনি ছিলেন পাপেটের স্রষ্টা, জলরঙের জাদুকর

রুহিনা ফেরদৌস
তিনি ছিলেন পাপেটের স্রষ্টা, জলরঙের জাদুকর
ছবি: মুস্তাফা মনোয়ার

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের, যাদের ঝুলিতে বিনোদন বলতে ছিল বিটিভি, তাদের শৈশবের বড় একটি অংশ জুড়ে আছে পারুল আর বাউল।

শুক্রবার সকাল, টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা, আর পাপেট চরিত্রগুলোর কথার আড়ালে শিক্ষামূলক বার্তা—আমাদের অমলিন শৈশব, অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি। সেই স্মৃতির কারিগর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।

প্রখ্যাত এই চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ এবং শিশুতোষ অনুষ্ঠানের কিংবদন্তি নির্মাতা গতকাল (২৯ জুন) ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা কেবল একজন শিল্পীকেই হারালাম না; হারালাম এমন একজন শিল্পস্রষ্টাকে, যিনি কয়েকটি প্রজন্মের শৈশবকে করে তুলেছিলেন অর্থপূর্ণ।

মুস্তাফা মনোয়ারকে অনেকে 'জলরঙের জাদুকর' বলেই চিনতেন। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন চিত্রশিল্পীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী, যিনি রঙ, রেখা, গল্প আর পুতুলকে একসঙ্গে মিলিয়ে শিশুদের জন্য নির্মাণ করেছিলেন এক অনন্য কল্পনার জগৎ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে গিয়ে তিনি শিশুদের মুখে ভয়, অনিশ্চয়তা আর যুদ্ধের ছাপ দেখেছিলেন। সেই মলিন মুখগুলোতে একটু হাসি ফিরিয়ে আনতেই আয়োজন করেছিলেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও শিল্প যে মানুষের মনে আশা জাগাতে পারে, সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু করেছিলেন। সেই ছোট্ট আয়োজন থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ পাপেটযাত্রা। পরে পারুল, বাউলসহ অসংখ্য চরিত্রের হাত ধরে তিনি বাংলাদেশের পাপেটশিল্পকে পৌঁছে দেন এক অনন্য উচ্চতায়। প্রজন্মের পর প্রজন্মের শৈশব হয়ে ওঠে আরও রঙিন, আরও অর্থবহ।

বাংলাদেশে আধুনিক টেলিভিশন পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর সৃষ্টি জনপ্রিয় চরিত্র 'পারুল'-এর নাম নেওয়া হয়েছিল বাংলার লোককথা 'সাত ভাই চম্পা' থেকে।

ষাটের দশকের শুরুতে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কলিম শরাফীর একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রথম তাঁর তৈরি পাপেট ব্যবহার করা হয়। পরে বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'আজব দেশে' অনুষ্ঠানে 'বাঘা' ও 'মেনি' চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তিনি পাপেট নাটকের নতুন এক ধারা উপস্থাপন করেন। সেই পথ ধরেই বাংলাদেশের টেলিভিশনে পাপেটশিল্প একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে।

চারুকলায় শিক্ষালাভের পর শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও তিনি নিজেকে কখনও একটি পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। শিক্ষক, টেলিভিশন প্রযোজক, নির্দেশক, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং পাপেটশিল্পী—প্রতিটি ভূমিকাতেই তিনি রেখে গেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। সেই লোকজ ঐতিহ্যকে আধুনিক উপস্থাপনার সঙ্গে মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেন কাহিনিনির্ভর পাপেট নাটক। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের পাপেটশিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পায়। মস্কো, তাশখন্দসহ বিভিন্ন দেশে পরিবেশনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পীসত্তার ভিতও তৈরি হয়েছিল একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবারে। তিনি ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। সাহিত্য ও সংস্কৃতির আবহেই তাঁর বেড়ে ওঠা, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর শিল্পচর্চাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় অবদান রয়েছে। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। দেশাত্মবোধক ছবি আঁকার কারণে কৈশোরেই কারাবরণ করতে হয়েছিল তাঁকে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম রূপকার তিনি। শিশু-প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র রূপকারও মুস্তাফা মনোয়ার।

দীর্ঘ শিল্পজীবনে দেশে-বিদেশে নানা স্বীকৃতিতে সম্মানিত হয়েছে তিনি। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স বিভাগে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরং—দুই বিভাগেই পান স্বর্ণপদক। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে ‘সুলতান স্বর্ণপদক’ প্রদান করে।

মুস্তাফা মনোয়ার এমন একজন শিল্পীসত্তা, যিনি শিল্পকে শিশুদের আনন্দ, শিক্ষা আর মানবিকতার সঙ্গে মিলিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে।