দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারী ও শিশু, বাড়ে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন: গবেষণা

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে নারী ও শিশু, বাড়ে সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন: গবেষণা
বাঁশখালীতে বন্যার পানির কারণে জনজীবনে ভোগান্তি

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু ঘরবাড়ি ও জীবিকা ধ্বংস করে না, বরং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সামাজিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়লে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক তৌহিদুল হকের তত্ত্বাবধানে পুলিশ স্টাফ কলেজ একটি গবেষণা পরিচালনা করে‌। ‘বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগ ও অপরাধসংক্রান্ত গবেষণা’ শীর্ষক গবেষণায় এ সম্পর্কিত তথ্য উঠে এসেছে।

বাগেরহাটে, খুলনা, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও বরগুনা - দেশের পাঁচটি উপকূলীয় জেলার ৩৮৫ জন মানুষের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে নারীর হার ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ।

এ ছাড়া দুর্যোগকালীন বিভিন্ন ধরনের অপরাধের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতনের হার ৫৯ দশমিক ২০ শতাংশ এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগজনিত অপরাধের ক্ষেত্রে এ হার ৫৮ দশমিক ০৭ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দুর্যোগের সময় গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। জরুরি প্রসূতি সেবার ঘাটতির কারণে গর্ভপাত, প্রসবকালীন জটিলতা এবং কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং মাসিক স্বাস্থ্যসামগ্রীর সংকট নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেক নারী বাধ্য হয়ে পুরোনো কাপড়, পাতা বা খবরের কাগজ ব্যবহার করেন, যা মূত্রনালির সংক্রমণ (ইউটিআই) এবং প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি বা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ঘর থেকে বের হওয়া নারীরা প্রায়ই যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হন। দুর্যোগজনিত বিশৃঙ্খলার সুযোগে যৌন হয়রানির হার ৪২ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতন ও এ জাতীয় অপরাধের হার ৭৫ দশমিক ০৯ শতাংশে পৌঁছায়। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে বাল্যবিবাহের হার ২৩ দশমিক ৮৬ শতাংশে উন্নীত হওয়ার তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে।

খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দুর্যোগকালে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ দশমিক ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা খাদ্য ও নিরাপদ পানির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৯৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা।

গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০০২ সালের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দুর্যোগের সময়

স্বামীদের সহিংসতাসহ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বেড়ে যায়। বাংলাদেশ, ভারত, ফিলিপাইন, তানজানিয়া, গিনি ও যুক্তরাষ্ট্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসে আঘাত হানা এ দুর্যোগে বাংলাদেশের ৪৬ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং নারী-প্রধান পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার অভাব, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট, জীবিকা হারানো এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকি তাঁদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে।

নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গবেষণায় কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ মানুষ দুর্যোগকবলিত এলাকায় কমিউনিটি পুলিশিং চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। পাশাপাশি জাপানের ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ মডেল’ অনুসরণের সুপারিশ করে বলা হয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন, ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিং এবং অপরাধ প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।