অন্যেরা সংসারের হিসাব করে বছর বা মাসে, আমার ঘণ্টা আর দিনে: হোলি আর্টিজানে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা রবিউলের স্ত্রী

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম। এক দশক পরও তাঁর পরিবার সেই শোক বহন করে চলেছে।
একই সঙ্গে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘ব্লুমস’ স্কুল। তবে পর্যাপ্ত সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখন অনেকটাই খুঁড়িয়ে চলছে।
“তখন আমাদের বিয়ের বয়স ছয় বছর। কিন্তু দুজন মিলে সংসার করতে পেরেছি বড়জোর ছয় মাস। তারপর তো ও চলে গেল...ছোট সন্তান তখন আট মাসের ”
কথাগুলো বলতে বলতে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা। ১০ বছর আগের সেই রাতের স্মৃতি এখনো তাঁর কণ্ঠ ভারী করে দেয়।
উম্মে সালমা রোকেয়া কালেক্টিভকে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে আমরা ভালো আছি। কিন্তু যে হারায়, সেই-ই জানে হারানোর কষ্ট কতটা গভীর। আমার সন্তানরা তাদের বাবাকে অনুভব করে, আমার শাশুড়ি প্রতি মুহুর্তে তার বড় সন্তানকে অনুভব করেন, আমিও করি। আমাদের পুরো পরিবার আজও ওকে প্রতিনিয়ত অনুভব করে। রবিউল এমন একজন মানুষ ছিল, যার সঙ্গে একবার মিশলে কেউ ভুলতে পারেব না, তার সম্পর্কে খারাপ কিছু বলতে পারবে না।”
স্বামীকে হারানোর স্মৃতি বলতে গিয়ে উম্মে সালমা জানান, বিয়ের কিছুদিন পরই রবিউল ইতালিতে যান। সেখান থেকে মাস্টার্স ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ, বদলি ও কর্মব্যস্ততার কারণে স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে থাকার সুযোগ খুব কমই হয়েছিল।
তিনি বলেন, “মানুষ সংসারের হিসাব করে বছর বা মাস দিয়ে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেই হিসাব করতে হয় ঘণ্টা বা দিনের হিসেবে। আমরা যে সংসার পেতেছিলাম, সেখানে বড় জোর টানা ছয় মাসের মতো আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তারপরই সেই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।”
হামলার দিন সকাল ১১টার দিকে শেষবারের মতো স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন রবিউল করিম। তখন উম্মে সালমা দ্বিতীয় সন্তানের গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে ছিলেন।
তিনি বলেন, “প্রতিদিনের মতোই শরীরের খোঁজখবর নিচ্ছিল। কিন্তুকথা শেষ হলেও সেদিন অনেকক্ষণ ফোনটা ধরে রেখেছিল, কলটা কাটছিল না। আমি বললাম, কী হয়েছে? সে বলল, কিছু হয়নি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, যেন কিছু বলতে চাইছিল। আজও জানি না, সে কী বলতে চেয়েছিল।”
বড় ছেলে সাজিদুল করিম সামি’র বয়স তখন মাত্র ৫ বছর। আর মেয়ে কামরুন্নাহার রায়না জন্ম নেয় বাবা নিহত হওয়ার একমাস পরে। এখন তারা ক্লাস নাইন এবং ক্লাস ফাইভে পড়ে।
উম্মে সালমা বলেন, “ছেলেটা বাবাকে পেয়েছে, তাই তাকে নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে। কিন্তু মেয়েটা বাবাকে দেখেনি। ছবি দেখে, মানুষের মুখে গল্প শুনে বাবাকে কল্পনা করে। অনেক সময় বলে, ‘আমি তখন বাবার সঙ্গে ছিলাম।’ ওর কাছে বাবাকে চেনার একমাত্র উপায় হলো অন্যদের স্মৃতি।”
পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ের বাইরেও রবিউল করিমের আরেকটি পরিচয় ছিল সমাজসেবক হিসেবে। নিজের গ্রাম মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কাঠিগ্রামে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ‘ব্লুমস’ নামে একটি স্কুল।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
উম্মে সালমা বলেন, “স্কুলটি এখনো চলছে। কিন্তু রবিউল যেভাবে এটিকে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, সেভাবে এগিয়ে নেওয়া আমাদের জন্য সহজ হয়নি। প্রতিষ্ঠানের সদস্য, ওর বন্ধু আর শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় এটি টিকে আছে।”
রবিউলের পরিকল্পনা শুধু একটি স্কুলেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
তিনি বলেন, “ওর স্বপ্ন ছিল এটিকে আবাসিক স্কুল করা। পরে সেখানে একটি বৃদ্ধাশ্রমও করবে। রবিউল ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করত। ঘুরে বেড়াতে গিয়ে দেখত, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে নিয়ে একটি পরিবার কতটা সংগ্রাম করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এই স্কুল করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি গ্রামের অসহায় বৃদ্ধদের জন্যও কিছু করতে চেয়েছিল।”
উম্মে সালমার ভাষায়, “রবিউল নিজের জন্য কিছু করেনি। মানুষের জন্যই সব স্বপ্ন দেখেছিল।”
হোলি আর্টিজান হামলায় রবিউল করিমের পাশাপাশি নিহত হন বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দিন খান। তাঁদের স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মাণ করা হয় ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্য।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভাস্কর্যটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে সেটি আর সংস্কার করা হয়নি। একই সঙ্গে রবিউল করিমের স্মরণে ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকের নাম রাখা হয়েছিল ‘রবিউল গেইট’। কিন্তু এখন সেখানে গেলে এটি যে ‘রবিউল গেইট’, তা আর বোঝার উপায় নেই। কারণ, ফটক থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে রবিউল করিমের নামসংবলিত ফলকটি।
এ প্রসঙ্গে উম্মে সালমা বলেন, “মানুষ ভালোবেসে ওকে স্মরণ করার জন্য ভাস্কর্য বানিয়েছিল। আমি কাউকে কিছু করার দাবি জানাই না। তবে যদি সত্যিই মানুষ ভালোবেসে ও সম্মান দেখানোর জন্য এগুলো করে থাকে, তাহলে সেই সম্মান টিকে থাকা উচিত।”
ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে রবিউলের নাম ফলক সরিয়ে ফেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি নিরাপত্তাবেষ্টিত স্থান থেকে নামফলক কীভাবে উধাও হলো, তা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়।
তিনি বলেন, যদি সত্যিই তাঁকে ভালোবেসে এবং সম্মান জানাতে ওই নামকরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই নামফলক আবার স্থাপন করা উচিত। তা না হলে পুরো বিষয়টিই আমার কাছে প্রহসনের মতো মনে হবে। তখন এটিকে প্রকৃত সম্মান বা ভালোবাসার প্রকাশ বলে মনে হবে না।”
দশ বছর পর রাষ্ট্রের কাছে তাঁর কোনো প্রত্যাশা আছে কি না, এমন প্রশ্নে উম্মে সালমার উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত।
“দেশের কাছে, সরকারের কাছে আমার কোনো দাবি নেই। শুধু সবার কাছে দোয়া চাই। আমার সন্তানরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, বাবার আদর্শ ধরে রাখতে পারে। এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।”
২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাগুলোর একটি। গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র হামলায় দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন নিহত হন। হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে প্রাণ দেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
দশ বছর পরও রবিউল করিমের পরিবারের কাছে সময় যেন থেমে আছে সেই রাতেই। তবে তাঁর স্বপ্ন এখনো পুরোপুরি থেমে যায়নি। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে হলেও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য গড়ে তোলা স্কুলটি চলছে। উম্মে সালমা বিশ্বাস করেন, এই প্রতিষ্ঠানই মানুষের জন্য নিবেদিত রবিউল করিমের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।






