পানিবন্দি লাখো মানুষ; ২৪ ঘণ্টায় উন্নতির আশা

"যা ছিল সব শেষ"

কাজী তাসরিম ছাবেরী রিম
চট্টগ্রাম
"যা ছিল সব শেষ"
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে রাস্তাঘাট পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে

বাঁশখালীর মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না। অনেক সাধের ছয় দেওয়ালের বাড়ি পেছনে ফেলে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন। শুনেছেন বাড়িটা ধসে গেছে।

"অনেক কষ্টে বাড়িটা করেছিলাম, আমার বাচ্চাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, সব শেষ," আজ শনিবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নারী রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।

"ভেতরে যা ছিল সব শেষ," যোগ করেন তিনি। কান্নার দমকে কথা বলতে পারছিলেন না। বানভাসী এই মানুষেরা লজ্জায় কারো কাছে কিছু চাইতে পারেন না।

আজ শনিবার এক বিঘৎ পরিমাণ পানি কমেছে। এর মধ্যেই অনেক ঘরবাড়ির খোঁজখবর করছিলেন। ধসে যাক, তবু নিজের বাড়ি তো একান্ত নিজের‌।

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।

কোথাও কোথাও পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও জেলার অধিকাংশ বন্যাকবলিত এলাকায় মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। বুক সমান পানি, খাবার পানির সঙ্কট, কোথাও বিদ্যুৎ নেই।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু চট্টগ্রাম জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার মানুষ পানিবন্দি। এখন পর্যন্ত বন্যাসংশ্লিষ্ট ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ১২ জন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ উপজেলা। এর মধ্যে সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। এছাড়া বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতেও বন্যা পরিস্থিতির কারণে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জেলা প্রশাসনের অনুরোধে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশনের সদস্যরা সাতটি উপজেলায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করতে দুর্গত এলাকায় একাধিক অস্থায়ী ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে।

এদিকে সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম, পার্বত্য অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলে অতিভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা কমেছে এবং ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তাও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

দুর্ভোগের শেষ নেই

দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। সাতকানিয়া উপজেলার ১০ নম্বর কেউচিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শান্ত মল্লিক বলেন, “পানি উঠেছে সাত দিন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন পাঁচ দিন। পুরো গ্রামে বুকসমান পানি। অনেক বাড়িতে মানুষ পানিবন্দি, এখনো পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি।”

চন্দনাইশের বৈলতলী এলাকার ব্যবসায়ী মোঃ মুন্না বলেন, “বাড়ির সামনে এখনও পানি রয়েছে, যদিও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। রাস্তাঘাট পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বাড়ির ভেতরেও পানি ঢুকেছে, এমনকি বৈলতলী মাদ্রাসাতেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।”

একই এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, “বাড়ির সামনের পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পুকুরের পানি বেড়ে যাওয়ায় আমার সব মাছ ভেসে গেছে। "

তিনি আরও বলেন, তাঁর ১৫টি টমটম ই ঘরে বসা। কারণ রাস্তা পানির নিচে এবং গর্ত দেখা যায় না।

স্থানীয় গৃহিণী হাফসা বেগম জানান, “আমার মা বাথরুমে পড়ে কোমরে আঘাত পেয়েছেন। তাঁকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও চারদিকে পানি থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।"

অন্যদিকে বাঁশখালীর বৈলছড়ি এলাকার বাসিন্দা আলী নেওয়াজ এখন শুধু বৃষ্টি থামার আশায় আছেন।

"আজ বৃষ্টি কম থাকলে কিছুটা নামার সম্ভাবনা আছে। আগামীকাল পূর্ণিমা থাকায় পানি আরও বাড়তে পারে, " তিনি বলেন।

অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছেন, আবার অনেকে বাড়ি ছাড়ছেন না। ঘরে যে খাবার মজুত আছে, তা দিয়েই চলতে হচ্ছে।

প্রশাসন জানিয়েছে, পানি কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে সময় লাগবে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণের কাজ অব্যাহত রয়েছে।