চিকিৎসক ধীপ্রার মৃত্যু ঘিরে অনেক অভিযোগ: শ্বশুরের দাবি যাদের ভালো বিয়ে হয়নি তারা 'জেলাসি' থেকে কথা ছড়াচ্ছে

আরিফ হোসাইন
চিকিৎসক ধীপ্রার মৃত্যু ঘিরে অনেক অভিযোগ: শ্বশুরের দাবি যাদের ভালো বিয়ে হয়নি তারা 'জেলাসি' থেকে কথা ছড়াচ্ছে
ছবি: সংগৃহীত

চিকিৎসক নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রা মারা যান ৪ জুন। বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সাবেক ছাত্রী ধীপ্রার দুই বছরের একটি সন্তান আছে। স্বামীও চিকিৎসক, নাম রহমত রশিদ সিয়াম।

জানা যায়, ধীপ্রা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। তবে তাঁর মৃত্যুর কিছু পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি পেজ থেকে অ্যানোনিমাস একটি পোস্ট ঘুরতে থাকে। সহপাঠী ও বন্ধু-বান্ধবরা পোস্টটি ধীপ্রার বলে জানায়।

ওই পোস্টে ধীপ্রা শ্বশুরবাড়িতে তাঁর ওপর অব্যাহতভাবে ঘটে চলা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং একাকীত্বের করুণ বর্ণনা দেন। জানান, নিজে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগলেও পরিবারের কোনো সহযোগিতা পাননি। তাঁর নিজের মা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। ফলে এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি, সন্তানকে সামলানো ও মানসিক অশান্তি তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

“আমার পোস্টপার্টাম রিয়েলি হার্ড ছিল। এখনও এই ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে পারিনি। থেরাপি নিচ্ছি। অনেক এক্সপেনসিভ। অ্যাজ আই অ্যাম নট আর্নিং নাউ, তাই নিয়মিত নিতে পারি না,” ওই পোস্টে ধীপ্রা লেখেন।

তিনি বলেন, কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে তাঁর চিকিৎসক স্বামী তাঁকে বলেন, “ফকিরের বাচ্চা, তোর আশেপাশে কেউ নাই।”

“এত গালাগালির মাঝে এই কথাটা আমার সবচেয়ে কষ্ট লেগেছে। সত্যিই তো আমার কেউ নাই।”

ধীপ্রার মৃত্যুর পর তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে নানা ধরনের পোস্ট লিখছেন চিকিৎসক ও তাঁর সহপাঠীরা। তবে তাঁর স্বামী রহমত রশিদ সিয়াম এ নিয়ে নিশ্চুপ। ধীপ্রার সহপাঠীদের অভিযোগ, সিয়াম স্ত্রীর মৃত্যুর পর অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেন।

শুধু সিয়াম নন।

সূত্রগুলো বলছে, ধীপ্রার শ্বশুর ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম এ রশিদ পুত্রবধূর মৃত্যুর পর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর তিন কন্যা; ধীপ্রাও তাঁদের একজন ছিলেন। তিনি সহকর্মীদের পুত্রবধূর জন্য দোয়া মাহফিলে যোগদানের অনুরোধ জানিয়ে পরে মাহফিল বাতিল করেন।

সহকর্মী-সহপাঠীরা যা বলছেন: আজ শুক্রবার বারডেম হাসপাতালের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে ধীপ্রার একজন সহপাঠী বলেন, ধীপ্রা একটি পোস্ট দিয়েছিলেন, যেখানে সব বলা আছে।

মৃত্যুর পর তিনি বন্ধুর কাছে গিয়েছিলেন।

“ওখানে গিয়ে আমরা শুনতে পাই, মৃত্যুর আগে তিন দিন ধীপ্রা না খেয়ে ছিলেন… এবং ধীপ্রা যখন আন্টিকে বলেন, মা আমি একটু ভাত খাব, তখন ওর মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে,” মানববন্ধনে ধীপ্রার বন্ধু বলেন।

ধীপ্রা যে তিন দিন ঘরবন্দী ছিলেন, তিনি যে কিছু খাননি, তা নিয়ে কারও কোনো খোঁজখবর ছিল না। তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগী ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর যত্ন নেয়নি।

“সবচেয়ে সন্দেহজনক যেটা, সেটা হলো বাসার কাছে মেডিনোভা, ইবনে সিনা, পপুলার, ল্যাবএইড এতগুলো হাসপাতাল থাকার পরও ধানমন্ডি থেকে কেন শাহবাগ পর্যন্ত টেনে আনা হলো? কাছের কোনো হাসপাতালে নিয়ে কি প্রাথমিক চিকিৎসাটা দেওয়া যেত না?” মানববন্ধনে ধীপ্রার বন্ধু প্রশ্ন রাখেন।

তাঁরা বলেন, ধীপ্রার পরিবারও কেন কিছু বলছে না, তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। হয়তো ধীপ্রার শ্বশুরবাড়ির লোকজন প্রভাবশালী।

চিকিৎসক ঝুমু খান এ নিয়ে একটি পোস্ট লিখেছেন। তিনিও বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন।

“কিছুদিন যেতে না যেতেই সিয়াম কেন কাপুরুষোচিত প্রভুতে পরিণত হলো? আর মেয়েটাই বা সহ্য করে গেল কেন? ওর কি কাছের কেউ নেই? উচ্চশিক্ষিত প্যাথলজিস্ট শাশুড়ি কেন গায়ে হাত তোলা শুরু করলেন? এটা কেমন কথা!

ডা. রশিদকে ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনি। উনার মতো ভদ্রলোক কেন এগুলো দেখলেন না! উনি তো একজন সজ্জন গুণী চিকিৎসক! উনি কি দেখলেন না উনার ছেলে এবং স্ত্রী মানসিকভাবে সুস্থ নন? একটা ডায়াবেটিক মেয়েকে তিন দিন ধরে খাবার না দিয়ে ঘর তালা দিয়ে বন্ধ করে রাখে কিভাবে যারা নিজেরাই চিকিৎসক!”

তিনি ধীপ্রার পরিবারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

“ধীপ্রার পরিবার কি বিয়ে দিয়ে মেয়ের প্রতি কর্তব্য শেষ করেছে? এরপর কি আর মেয়ের প্রতি তাদের দায়িত্ব নেই?”

‘জেলাসি’ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে— দাবি ধীপ্রার শ্বশুরের: ধীপ্রার শ্বশুর এম এ রশিদ রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, ধীপ্রা ছয় বছর তাঁদের সংসারে ছিলেন। তিনি পরিবারের সদস্য ছিলেন, সবই স্বাভাবিক ছিল। কোনো অস্বাভাবিকতা তাঁর চোখে পড়েনি।

ধীপ্রার মৃত্যুর পর উত্থাপিত কারণ সম্পর্কে বলেন, সামাজিকভাবে হেনস্তা করতে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয়ে থাকতে পারে।

“আমি খুবই শকড হচ্ছি এ সমস্ত নিউজগুলো দেখে। এখানে বোঝেন, যারা অনেক সময় জেলাসি থাকে— অনেকের ভালো বিয়ে হয়েছে, অনেকের হয়নি— এগুলো অনেক সময় জেলাসি থেকে হয়। আউট অব জেলাসি অনেক সময় এগুলো হয়ে যায়,” এম এ রশিদ বলেন।

তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার বলেও দাবি করেন। তিনি জানান, ধীপ্রার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল এবং তিনি নিয়মিত ওষুধ সেবন করতেন। ২ জুলাই এফসিপিএস পরীক্ষা ও সন্তান সামলানোর ‘স্ট্রেস’ ছিল। ঘরে গৃহকর্মীও বাড়ি গিয়েছিল।

এম এ রশিদের দাবি, ধীপ্রার চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হয়নি। তাঁর সহকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন।

অ্যানোনিমাস পোস্টটি তাঁর পুত্রবধূর নয় বলেও দাবি তাঁর। কারণ শাশুড়ি সম্পর্কে ধীপ্রা যা লিখেছেন, তা তাঁর ভাষায় ‘হান্ড্রেড পারসেন্ট মিথ্যা’।