ফ্যামিলি কার্ডের টাকা নারীরাই খরচ করছেন, কার্ডের সুবিধা চান আরো অনেকে

মাসের শেষ সপ্তাহেই নিজের মোবাইল ফোনে একটি বার্তা পান কড়াইল বস্তির বাসিন্দা কুসুম বেগম। ফ্যামিলি কার্ডের ভাতার টাকা এসেছে। বার্তাটি তাঁর কাছে শুধু কিছু টাকা পাওয়ার খবর নয়, সংসারের কয়েকটি জরুরি খরচ মেটানোর নিশ্চয়তাও।
বৌবাজারে স্বামীকে নিয়ে ছোট্ট একটি ভাতের হোটেল চালান কুসুম। এটুকু করতে গিয়ে ঘাড়ে জমেছে ঋণের কিস্তির বোঝা। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা দিয়ে সেই কিস্তি শোধ করেন, আবার বরিশালে পড়াশোনা করা মেয়ের কাছেও কিছু টাকা পাঠাতে পারেন।
“এতে নিজের কাছেই নিজের সম্মানটা একটু বাড়ে,” রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন কুসুম বেগম।
তবে কুসুমের অভিজ্ঞতা কড়াইলের সব নারীর নয়। তথ্য দেওয়ার পরও কার্ড পাননি অনেকে। আবার যাঁরা পেয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেরা টাকা তুলতে পারেন না। কেউ প্রথম কিস্তি পেয়েছেন, পরে আর পাননি। ফলে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্য নিয়ে চালু হওয়া এই কর্মসূচি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।
বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। এতে পরিবারকে উন্নয়নের মূল একক ধরে কার্ড দেওয়া হচ্ছে নারী প্রধানের নামে। সরকারের দাবি, এতে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ বাড়বে।
প্রাথমিকভাবে দেশের ১৩টি এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে কর্মসূচিটি চালু করা হয়েছে। গত ১০ মার্চ কড়াইল বস্তি সংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে এর উদ্বোধন করা হয়।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কারও কাছে ভরসা, কারও কাছে সঞ্চয়ের সুযোগ
স্বামী না থাকায় দুই মেয়েকে নিয়ে একাই সংসার চালান পিংকি। বনানীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করেন তিনি।
“যদি কোনো মাসে কাজ না-ও থাকে, তবু জানি একটা টাকা হাতে আসবে। মেয়েদের জন্য খরচ করতে পারি,” বলেন তিনি।
শিক্ষার্থী আসমা আক্তার ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ খরচ না করে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছেন। এই অর্থ দিয়ে তিনি একটি ডিপিএস খুলেছেন।
আর কুসুম বেগমের মতো কেউ কেউ ঋণের কিস্তি পরিশোধে এই অর্থ ব্যবহার করছেন।
তবে মাঠপর্যায়ে কথা বলে দেখা যায়, নারীরা নিজের জন্য নয়, মূলত পরিবারের প্রয়োজনেই এই অর্থ ব্যয় করছেন। সন্তানদের পড়াশোনা, খাদ্য ব্যয়, ঋণ পরিশোধ কিংবা জরুরি খরচ মেটাতেই টাকাগুলো ব্যবহার হচ্ছে।
বাদ পড়ার অভিযোগ
স্বামী মারা যাওয়ার পর একাই সংসার চালান হাসিনা বেগম। তাঁর অভিযোগ, সব তথ্য দেওয়ার পরও তিনি কার্ড পাননি।
“আমার পরিবারে আমিই উপার্জন করি। এই টাকাটা খুব দরকার ছিল। কিন্তু কার্ড পাইনি,” বলেন তিনি।
একই অভিযোগ শেফালিরও। পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। স্বামীর শারীরিক সমস্যার কারণে তিনি কাজ করতে পারেন না।
শেফালি বলেন, “এই টাকাটা আমার মতো মানুষেরই বেশি দরকার ছিল। যা যা তথ্য চেয়েছে, সব দিয়েছি। পরে আর কেউ খোঁজ নেয়নি।”
এ অভিযোগ শুধু দু-একজনের নয়। তথ্য সংগ্রহের পরও অনেক পরিবার কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নারীর নামে টাকা, নিয়ন্ত্রণ কতটা?
সরকারের যুক্তি, পরিবারের নারী প্রধানের নামে অর্থ পৌঁছালে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়বে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে চিত্রটি পুরোপুরি সেরকম নয়।
অনেক নারী নিয়মিত অর্থ পেলেও ডিজিটাল কার্ড হাতে পাননি। আবার মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে দক্ষ না হওয়ায় নিজেদের টাকা নিজেরা তুলতে পারেন না।
শামসুন্নাহার বলেন, “টাকা আমি তুলতে পারি না, ছেলে তুলে দেয়।”
তবে টাকা তিনি খরচ করেন বলেই জানান।
মোছা. সেলিনাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। বনানীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করা এই নারী জানান, টাকা তাঁর নামে এলেও তা তুলতে অন্যের সহায়তা লাগে।
তবে সরকারও এখন জানতে চায়, এই অর্থ সহায়তা মানুষের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে তিনি বলেন, উপকারভোগীরা ভাতা পেয়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমানের ক্ষেত্রে কতটা এগিয়ে যাচ্ছেন, তা মূল্যায়ন করা হবে। এই কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, ফলে এর বাস্তব প্রভাব যাচাই করা প্রয়োজন।






