প্রেশার কুকার কি আসলেই নারীবাদী সিনেমা?

পোস্টারে কেবলমাত্র চার নারীর ছবি। তাই রায়হান রাফীর “প্রেশার কুকার” দেখার ব্যাপারে বেশ আগ্রহ বোধ করছিলাম। মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই নির্মাতার “সুড়ঙ্গ” আর “তুফান” হলে গিয়ে দেখেছি। দুটি চলচ্চিত্রের গল্পই নায়কনির্ভর। “প্রেশার কুকার”-এ পুরুষ চরিত্রের কমতি নেই, তবে কেউ নায়ক নন। ফেসবুকেও অনেকে চলচ্চিত্রটিকে ‘নারীবাদী’ বলেই দাবি করলেন। তাই হলে যেতেই হলো, তবে যাওয়ার পর যা হলো সেটার জন্য আসলে মনে মনে প্রস্তুত ছিলাম।
বাংলাদেশের বড় পর্দায় নারীকেন্দ্রিক আখ্যান বিরল নয়। শাবানা, ববিতা তো বটেই, এমনকি পপিও এমন বহু চলচ্চিত্র টেনে নিয়ে গেছেন। তবে দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্রে নারী যতক্ষণ সামাজিক সীমারেখার মধ্যে থাকে ততক্ষণ সব ঠিক, লক্ষ্মণরেখা পার করলেই নেমে আসে শাস্তির নির্মম বিধান। আর “প্রেশার কুকার”ও পুরুষতান্ত্রিকতার সে রেখা পার করতে পারেনি।
দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্রে নারীর বিচ্যুতির একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা বিদ্যমান। যে নারী যৌন স্বায়ত্তশাসন দাবি করে, পিতৃতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করে, অথবা নিজের শরীর ও ইচ্ছার ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায় — সে চরিত্র আখ্যানের শেষে সামাজিক অবমাননা, লাঞ্ছনা বা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। এটি কেবল নৈতিক দণ্ড নয়, এটি একটি মতাদর্শিক প্রক্রিয়া, যা দর্শককে শেখায় কোন নারী ‘যোগ্য’ আর কোন নারী ‘পতিত’। “প্রেশার কুকার” এই প্রক্রিয়াটিকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করে।
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র রেশমা বলে, যে ঢাকা নারীর জন্য একটি প্রেশার কুকার, যখন এই চাপ অসহ্য হয়ে ওঠে তখন সিটি বাজে। খেয়াল করুন, এখানে মুক্তির কোনো সক্রিয় এজেন্সি নেই; বরং আছে বিস্ফোরণের নিষ্ক্রিয় প্রতীক্ষা। নারী নিজে প্রতিরোধ করে না, সে কেবল ফেটে পড়ার জন্য অপেক্ষা করে। এই রূপকই আখ্যানের গোটা দার্শনিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
চলচ্চিত্রের প্রতিটি নারী চরিত্র কোনো না কোনোভাবে সমাজ-নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে। এবং প্রতিটি চরিত্রের জন্যই আখ্যান নিশ্চিত করে পরিণতিতে শারীরিক সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন, সামাজিক অবমাননা কিংবা মৃত্যু।
সিনেমাটির নামের সার্থকতা নিশ্চিত করতেই দর্শককেও প্রেশার কুকারের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলেছেন নির্মাতা। প্রাপ্তবয়স্ক সনদপ্রাপ্ত সিনেমাটিতে নির্মমতা ও সহিংসতা সবিস্তারে প্রদর্শিত হয়েছে। এখানেই আসে ছবির ফেটিশিস্টিক প্রবণতার প্রসঙ্গ। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক লরা মালভির ‘মেল গেজ’ তত্ত্বের আলোকে বলা চলে, ক্যামেরা প্রতিটি ফ্রেমে নারীর যন্ত্রণাকে দর্শনীয় করে তুলেছে। পর্দায় নারীর দেহ ও যাতনা একটি ‘স্পেকট্যাকল’ তৈরি করে, যা পুরুষ দৃষ্টির অভিপ্রায়কে পরিতৃপ্ত করে। নারীর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু সেই মুক্তি কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে দেওয়া হয় না।
নারীকে কেন্দ্রে রেখেও এমন একটি আখ্যান নির্মাণ করা হয়েছে যেখানে নারীর সংকট পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে সংজ্ঞায়িত, নারীর শাস্তি পুরুষতান্ত্রিক মানদণ্ডে নির্ধারিত এবং নারীর যন্ত্রণা পুরুষের বিনোদনের উপকরণে পরিণত। “প্রেশার কুকার”কে তাই আমি নারীবাদী বলতে নারাজ। বরং এটি সেই চলচ্চিত্র, যা দর্শককে ততক্ষণ পর্যন্ত চাপে রাখে যতক্ষণ না সে পুরুষতান্ত্রিক ভক্ষণের জন্য মোলায়েম হয়ে ওঠে।





