‘রাস্তা-সেতুর খরচও জেন্ডার বাজেট’, সরকারের হিসাবকে প্রশ্ন রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
‘রাস্তা-সেতুর খরচও জেন্ডার বাজেট’, সরকারের হিসাবকে প্রশ্ন রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের
ছবি: রেড ফেমিনিস্ট ব্লক এর ফেসবুক পেজ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জেন্ডার বাজেটকে ‘টেকনোক্র্যাটিক’ ও ‘জেন্ডার-অন্ধ’ বলে সমালোচনা করেছে রেড ফেমিনিস্ট ব্লক। সংগঠনটির দাবি, রাস্তা, সেতু ও অন্যান্য সাধারণ অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক ব্যয় এবং সবার জন্য প্রযোজ্য জনসেবামূলক খাতের ব্যয়কে জেন্ডার বাজেট হিসেবে দেখানো হলেও, সেগুলোর সঙ্গে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার সরাসরি সম্পর্ক স্পষ্ট করা হয়নি।

রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক অবস্থানপত্রে এসব মন্তব্য করে সংগঠনটি।

সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এটি মোট জাতীয় বাজেটের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশের সমান।

রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের ভাষ্য, গত দুই দশকে বাংলাদেশে জেন্ডার বাজেটিং ধীরে ধীরে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির একটি প্রশাসনিক বা ‘টেকনোক্র্যাটিক’ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

অবস্থানপত্রে বলা হয়, জেন্ডার বাজেট কোনো আলাদা বাজেট নয়; এটি মূল বাজেট বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতি, যার মাধ্যমে বোঝা হয় রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কতটা অংশ লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে সাধারণ উন্নয়ন ব্যয়কেই জেন্ডার বাজেট হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

সংগঠনটির দাবি, প্রস্তাবিত জেন্ডার বাজেটের প্রায় ৬১ শতাংশ, অর্থাৎ ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হচ্ছে বেতন, অফিস পরিচালনা, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিলসহ সাধারণ প্রশাসনিক কাজে। এসব ব্যয়কে জেন্ডার বাজেটের আওতায় দেখানোর যৌক্তিকতা নেই।

তাদের মতে, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের নামে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা পল্লী কর্মসংস্থানের মতো কর্মসূচিকে জেন্ডার বাজেট হিসেবে দেখানো হলেও, এগুলো কীভাবে বিশেষভাবে নারীদের বা লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে, সে বিষয়ে বাজেটে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

অবস্থানপত্রে আরও বলা হয়, বর্তমান বাজেটে ‘জেন্ডার’ বলতে কার্যত নারী ও পুরুষকেই বোঝানো হয়েছে। ট্রান্সজেন্ডার, আন্তঃলিঙ্গ ও অন্যান্য লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের বাস্তবতা, বৈষম্য ও প্রয়োজনীয়তা সেখানে অনুপস্থিত। ফলে এটি একটি ‘জেন্ডার-অন্ধ’ নথিতে পরিণত হয়েছে।

সংগঠনটির মতে, জেন্ডার বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর মতো সাধারণ জনকল্যাণমূলক খাতে দেখানো হলেও, কোন মানদণ্ডে এসব ব্যয়কে জেন্ডার-সম্পর্কিত ব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

রেড ফেমিনিস্ট ব্লক আরও অভিযোগ করেছে, নীতিমালা ও কৌশলপত্র তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও বাস্তবায়নে তার প্রতিফলন খুব কম। এতে রাষ্ট্র বাস্তব পরিবর্তনের বদলে ‘ডকুমেন্ট তৈরির কারখানায়’ পরিণত হচ্ছে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নারীদের ও লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও বাজেটে জলবায়ুকে স্বতন্ত্র জেন্ডার থিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একই সঙ্গে আদিবাসী নারী, দলিত, বেদে সম্প্রদায়, যৌনকর্মী, ট্রান্সজেন্ডার ও আন্তঃলিঙ্গ মানুষের জন্যও সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বা কর্মপরিকল্পনার অভাব রয়েছে।

অবস্থানপত্রে বলা হয়, দেশের শ্রমশক্তির বড় অংশ নারী হলেও শ্রমজীবী নারীদের জন্য পৃথক বাজেট কাঠামো নেই। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে জেন্ডার-সংবেদনশীল বরাদ্দ আগের বছরের তুলনায় কমেছে বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।

রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের মতে, কেবল বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ালেই লিঙ্গ বৈষম্য দূর হবে না। সম্পদের অসম বণ্টন, শ্রমের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, মজুরি বৈষম্য এবং বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে জেন্ডার বাজেট কার্যকর হতে পারে না।

সংগঠনটি জেন্ডার বাজেট প্রণয়নে স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণ, প্রশাসনিক ব্যয়কে জেন্ডার বাজেটের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া, লিঙ্গ বৈচিত্র্যের মানুষের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে হটলাইন ও ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার সম্প্রসারণ, প্রতিটি বিভাগে ডিএনএ ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন, ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার গড়ে তোলা, আন্তঃলিঙ্গ ও ট্রান্সজেন্ডার মানুষের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকায় উন্নীত করা, জলবায়ু পরিবর্তনকে জেন্ডার বাজেটের স্বতন্ত্র থিম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং শ্রমজীবী নারীদের জন্য পৃথক বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।

রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের ভাষ্য, জেন্ডার বাজেটকে কেবল সংখ্যার হিসাব হিসেবে নয়, বরং লিঙ্গ ও শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্য দূর করার কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।