বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী কি কৌশলে ট্রাম্পকে হারালেন?

জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) দুই দফা স্বল্পকালীন বিরতি বাদে সরকার পরিচালনা করে আসছে সেই ১৯৫৫ সাল থেকে। তবে গত ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে দলটি এত বড় জয় পায়নি। নিম্নকক্ষের প্রায় ৭০ ভাগ আসনই এবার তাদের দখলে। আর এই জয় এসেছে তাকাইচি সানায়ের নেতৃত্বে। ইকোনমিস্ট তাঁকে চিত্রিত করেছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী হিসেবে।
তবে তাকাইচি সরকার গঠনের পরপরই মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে এমন এক দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, জ্বালানির জন্য যে দেশের ওপর জাপান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ।
সঙ্গত কারণেই জাপান তো বটেই, এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো অনেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে তাকাইচির পারফরমেন্স কেমন হয় সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন। কারণ এটা আগেই অনুমিত ছিল যে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জাপানকে টেনে আনবেন।
ট্রাম্পকে আলিঙ্গন, বিশ্বের শান্তি কেবলমাত্র ট্রাম্পই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন এমন প্রশংসাসূচক বাক্যের ব্যবহার, ট্রাম্পপুত্রকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোসহ আরও নানাবিধ রিল এখন সমাজমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হতে পারে তাকাইচি হয়তো ট্রাম্পের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন।
তবে সফর শেষে জাপান টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড বলছে, তাকাইচিই আদতে এই প্রতিযোগিতায় ট্রাম্পকে হারিয়ে দিয়েছেন।
কারণ তাকাইচি ইরানের প্রসঙ্গ সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। আর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা খুব স্পষ্ট নয়। বলেছেন, "আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে যেন আমাদের সকলের যে লক্ষ্য তা পূরণ করা যায়।"
যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা বেসামরিক জনগণ যেসব স্থাপনায় বসবাস করে থাকেন, এবং তেল-গ্যাস ক্ষেত্র ও অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছানোর কথা বলেন। হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতে "উপযুক্ত" কোনো ব্যবস্থায় যুক্ত থাকার কথাও বলেন।
তবে জাপান কোনো সামরিক অভিযানে যুক্ত হতে রাজি না। কারণ দেশটির শান্তিবাদী সংবিধান এ ধরনের অভিযানে জড়ানোর অনুমোদন দেয় না।
এর বদলে জাপান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। জ্বালানি সুরক্ষা, সাপ্লাই চেইন , প্রযুক্তি ও ক্রিটিক্যাল মিনারেলের ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলেছে।
চীন, উত্তর কোরিয়া , ইন্দো-প্রশান্তমহাসাগরীয় কৌশল ইস্যুতে তাঁরা ঐকমত্যে পৌঁছেছেন।
এক কথায় তাকাইচি মিত্র দেশের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন ঠিকই, তবে কোনো শর্তে রাজি হননি।
কিন্তু এই সফরে ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের পার্ল হারবারে হামলার প্রসঙ্গ টেনে রসিকতা করেছেন, এ সময় তাকাইচির প্রতিক্রিয়া ছিল দেখার মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান - দু'দেশের কেউই এ নিয়ে পরে আর কোনো মন্তব্য করেননি।
দ্যা নিউ ইয়র্ক টাইমসও একই মন্তব্য করেছে। বলেছে, তাকাইচি মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় এই বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্প যে নিন্দামন্দ করে চলেছেন, সে প্রসঙ্গের বিস্তারিততে তাকাইচি ঢোকেননি। ৭৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেছেন।
তাকাইচির কৌশলই ছিল প্রগলভতা। তাকাইচি বলেন,"আমি জোরালো ভাবে বিশ্বাস করি, কেবলমাত্র আপনি, ডোনাল্ড, যে কি না এই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।"
এই মন্তব্যে ট্রাম্পও বেজায় খুশি । তিনি রক্ষণশীল রাজনীতিক তাকাইচি সম্পর্কে বলেন, "তাকাইচি খুবই জনপ্রিয়, শক্তিশালী নারী।" জাপানেরও প্রশংসা করেন, "তারা সত্যিই
কঠিন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসে কাজ করতে পারে।"
নোট: জাপানে তাকাইচির ভূমিধস বিজয়কে বিশ্লেষকরা নারীবাদের জয় বলতে রাজি নন। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ক্রিস্টিন রোবাক বলেন, তাকাইচির জয় নারী-পুরুষের সমতার জয় নয়।
জেন্ডার ইস্যুতে তাকাইচির দৃষ্টিভঙ্গি গৎবাঁধা। এমনকি তিনি সম্রাটের উত্তরাধিকার হিসেবে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে।





