মা ফিরেছেন “ঈদের কাছে”

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
মা ফিরেছেন “ঈদের কাছে”
girls

প্রায় এক বছর আগে শেষবারের মতো নিজের ছেলেকে ছুঁয়েছিলেন পোশাক শ্রমিক জেসমিন আক্তার জুঁই। কারণ, বছরে দু’বার —দুই ঈদে বাড়ি ফিরতে পারেন তিনি।

“শেষবার আমি আমার ছেলেকে দেখেছিলাম প্রায় এক বছর আগে, ঈদের সময়। আমি বছরে মাত্র দু’বার বাড়ি যেতে পারি—দুই ঈদে,” ঈদের আগের রাতে বলছিলেন জুঁই।

তিনি রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, “এবার বাড়িতে পা রাখতেই আমার ছেলে দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে!”

তাঁর সাত বছরের ছেলে, তন্ময় রাহাত, ছুটির পুরো সময়টা বাবা-মায়ের মাঝখানে ঘুমায়। মা-ছেলে চেষ্টা করত যতটা সম্ভব একে অপরকে জড়িয়ে থাকে।

“সে-ই আমার ঈদ, তার কাছে ফেরাটাই আমার ঈদের আনন্দ," বলছিলেন জুঁই।

দেশের প্রায় ৪০ লাখ পোশাকশ্রমিকের একজন জুঁই। প্রায় চার হাজার কারখানায় কাজ করেন এসব শ্রমিকেরা। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই পোশাক শিল্প।

এই কারখানাগুলো মূলত ঢাকা এবং ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত এবং এগুলো মূলত নারী শ্রমিক নির্ভর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শ্রমিকরা কারখানার আশপাশের বাসায় থাকেন। প্রায় প্রতিটি পরিবারকে ছোট একটি ঘর, আর রান্নাঘর ও টয়লেট ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। এসব বাসার বেশির ভাগই ঘিঞ্জি পরিবেশ। তারা যে সামান্য মজুরি পান, ত্তে বেশির ভাগ শ্রমিকেরই খুব ভাল পরিবেশে থাকার সামর্থ্য হয় না।

এমন পরিস্থিতিতে অনেককেই বাধ্য হয়ে তাদের সন্তানদের গ্রামে দাদা-দাদী বা নানা-নানীর কাছে রেখে আসতে হয়।

জুঁইয়ের বাড়ি নাটোর জেলায়। তার একমাত্র ছেলেকে দেখাশোনা করেন তাঁর বাবা-মা।

একই রকম গল্প সুমি খাতুনেরও। তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীতে, তার পাঁচ বছরের ছেলেও থাকে নানাবাড়িতে।

ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন সুমি ও তাঁর স্বামী। ইন্টারনেটই এখন তাঁদের জীবনের ভরসা। নিয়মিত ভিডিও কলে সন্তানদের খোঁজ নেন।

ভিডিও কলেই তারা সন্তানের বড় হওয়া দেখেন। উচ্চতা, ওজন, খেলতে গিয়ে পাওয়া আঘাত, আর তাদের হাসি-কান্নার গল্প শোনেন।

“ছুটি যত এগিয়ে আসছিল, বাড়ি থেকে ফোনের সংখ্যাও তত বাড়ছিল। আমার ছেলের চাওয়ার তালিকা ছিল অনেক বড়,” রোাকেয়া কালেকটিভকে বলেন সুমি খাতুন।

“আমি সবই কিনেছি। পাঞ্জাবি-পায়জামা, শার্ট, প্যান্ট, জুতা—সবকিছু,” বলছিলেন তিনি।

কথা বলার সময় তাঁর কণ্ঠের উচ্ছ্বাস ফোনের এ প্রান্ত থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

“আপনি বুঝতেই পারবেন আমার কেমন আনন্দ লাগছে,” তিনি বলেন।

নওগাঁর আরমিনারা বেগমের গল্পও আলাদা নয়, তবে তাঁর কষ্ট আরও গভীর। কারণ, তিনি চাকরি হারিয়েছেন।

৫ আগস্টের পর রাজনৈতিপটপরিবর্তনের সময়ে প্রায় দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

অনেক কারখানা মালিক দেশ ছেড়ে চলে যান বা কারখানা বন্ধ করে দেন; কেউ কারাগারে যান, কেউ বিভিন্ন অজুহাতে উৎপাদন বন্ধ করেন।

এই পরিস্থিতির পর ন্যূনতম মজুরি সামান্য বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনও বেশি।

শ্রমিকদের মতে, কম মজুরি এবং শিশুদের দেখাশোনার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেককে সন্তানদের থেকে দূরে থাকতে হয়।

“আমার স্বামীর এখনও চাকরি আছে, কিন্তু আমার নেই,” আরমিনারা বলেন।

কয়েক মাসের শিশুকে নিজের কাছে রেখে, চার-সাড়ে চার বছরের ছেলেকে তিনি গ্রামে বাবা-মায়ের কাছে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন।

“আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, আমার কি ভীষণ খারাপ লাগে কখনও কখনও,” তিনি বলেন।

“আমার বড় ছেলে মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে সে কেন বাবা-মায়ের সাথে থাকতে পারে না? কোনো জবাব দিতে পারি না। যখন শুনেছে ঈদের ছুটিতে আমি বাড়ি আসছি, সে দিন গুনতে শুরু করেছে,” বলছিলেন আরমিনা।

“আমার ছেলেরা আমার কলিজা। সন্তান ছাড়া জীবন কতটা শূন্য লাগে, তা শুধু একজন মা-ই জানে," আনন্দের মাঝেও বিষাদ ঝরে পড়ে তার কণ্ঠে!