হজ: একাকী নারীর সংগ্রাম যেখানে ইবাদতের অংশ

হজের মৌসুম চলছে। গোটা দুনিয়ার মুসলমানরা হজের সময়, তা পালন করতে মক্কায় গিয়ে হাজির হন। কিছু বিধিবদ্ধ কাজ সারেন।
ক্লাসে আমাদের এক শিক্ষক বলেছিলেন, হজ হচ্ছে প্রেমের চূড়ান্ত প্রতীক। আপনি ঘর ছাড়বেন, প্রচলিত কাপড় ছাড়বেন, চুল ছাঁটবেন, ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটবেন, হাঁটতে থাকবেন। প্রেমে পড়ে উন্মাদ হয়ে গেলেও লোকে তাই করে। সে তার বাহ্যিক, শরীরী প্রদর্শনীর কথা ভুলে গিয়ে আত্মিক এক যাত্রায় নেমে যায়।
আর এই আত্মিক যাত্রাটা আমাদের শিখিয়েছেন এক নারী আদতে। হাজেরা আলাইহাস সালাম। হজরত ইসমাঈল নবীর মা।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রথমা স্ত্রী সারার গর্ভ থেকে যখন কোন সন্তান হচ্ছিল না অনেক চেষ্টার পরেও, তখন বিবি হাজেরার কাছে ইব্রাহিমের (আ.) বিয়ে দেন সারা নিজেই। আর হাজেরার গর্ভে ইসমাঈল (আ.) এসেছিলেন।
কিন্তু ইসমাঈল (আ.) চলে আসার পর সারার সেটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই তিনি মা-বেটাকে কোন এক দূর নির্জন জায়গায় নির্বাসনে দেওয়ার জন্যে ইবরাহিমকে (আ.) বললেন।
ইবরাহিম (আ.) তাই করলেন, সেই সময়ের দূর আর নির্জন জায়গা ছিল মক্কা। সেখানে কিছু খেজুর আর পানি দিয়ে হাজেরা আর ইসমাইল (আ.) রেখে আসলেন। ইবরাহিম (আ.) ফেরার সময় হাজেরা জিজ্ঞেস করলেন- “আপনি কি আমাদের এই নির্জন স্থানে রেখে চলে যাচ্ছেন?”
ইবরাহিম (আ.) প্রথমে উত্তর দেন নি। হাজেরা আবার প্রশ্ন করেন। শেষে তিনি জানতে চান- "এটা কি আল্লাহর নির্দেশ?” ইবরাহিম (আ.) বলেন- “হ্যাঁ।” তখন হাজেরার উত্তর ছিল-
“তাহলে আল্লাহ আমাদের নষ্ট করবেন না।”
বাহ্যত সারার ঈর্ষার শিকার দেখালেও আদতে হাজেরার (আ.) সেই নির্বাসনের নির্দেশ ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকেই। কারণ তিনি একটা নতুন শহর গড়বেন, তাঁর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে সেখানে পাঠাবেন। উদ্দেশ্য ছিল তাই।
তারপর শুরু হয় এক নারীর একাকী সংগ্রাম। মরুভূমির সেই জনমানবহীন উপত্যকায় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসে পানি। শেষ হয়ে যায় খেজুরও। শিশু ইসমাঈল (আ.) তৃষ্ণায় কাঁদতে থাকেন। আর হাজেরা বুঝতে পারেন, বসে থাকলে মৃত্যু নিশ্চিত।
তিনি উঠে দাঁড়ান। শিশুকে রেখে ছুটে যান সাফা পাহাড়ের দিকে। উপরে উঠে চারপাশে তাকান। কোথাও মানুষ নেই, পানি নেই, কাফেলা নেই। তারপর নেমে আবার ছুটে যান মারওয়ার দিকে। সেখানে গিয়েও কিছু পান না। আবার ফিরে আসেন। আবার যান।
এভাবে সাতবার।
আজকে আমরা হজে গিয়ে যে সাফা মারওয়ার মাঝে হাঁটি, সেই হাঁটা আসলে এক নারীর উদ্বিগ্ন দৌড়ের পুনরাভিনয়। ইসলামের ইতিহাসে এই জায়গাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে কোন বাদশাহর যুদ্ধ স্মরণ করা হচ্ছে না, কোন পুরুষ বীরের বীরত্বও না। স্মরণ করা হচ্ছে সন্তানের জন্য এক মায়ের পানির খোঁজে পাগলের মতো ছোটাছুটি।
এই জায়গাটা আমাকে খুব নাড়া দেয়। কারণ হাজেরা অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় বসে থাকেন নি। তিনি দৌড়েছেন। চেষ্টা করেছেন। খুঁজেছেন। অর্থাৎ তাওয়াক্কুলের মানে শুধু হাত গুটিয়ে বসে থাকা না, বরং মরিয়া হয়ে চেষ্টা করাও।
এক পর্যায়ে আল্লাহর রহমতে ইসমাঈলের (আ.) পায়ের কাছে পানি বের হতে শুরু করে। হাজেরা ছুটে এসে দুই হাতে পানি জড়ো করতে থাকেন। যেন মরুভূমির বুকে জীবন ফসকে না যায়। সেই পানিই জমজম।
আর আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, মক্কার ইতিহাস শুরু হয় এখান থেকেই। পরে মানুষ আসা শুরু করে, কাফেলা থামে, বসতি গড়ে ওঠে। আরও পরে ইবরাহিম আর ইসমাঈল (আ.) মিলে কাবা নির্মাণ করেন। অর্থাৎ ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র শহরের সূচনা হয়েছিল এক নারীর বেঁচে থাকার সংগ্রাম দিয়ে।
আমরা সাধারণত ধর্মের ইতিহাস পুরুষদের ইতিহাস হিসেবে শুনি। নবী, রাজা, যুদ্ধ, সাম্রাজ্য। কিন্তু হজের ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্য এক স্মৃতি। সেখানে লাখো মানুষ আজও এক নারীর দৌড় অনুসরণ করে। ইহরাম পরে, ক্লান্ত শরীরে, ঘামে ভিজে, তারা সাফা মারওয়ার মাঝে হাঁটে। যেন মানবসভ্যতা এখনো মনে রেখেছে, মরুভূমিতে একদিন এক নারী তার সন্তানের জন্য পানি খুঁজেছিলেন।
সম্ভবত এই কারণেই হাজেরার কাহিনি আজও এত আধুনিক লাগে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, ক্ষমতার ইতিহাস শুধু রাজা, সাম্রাজ্য বা রাষ্ট্রের ইতিহাস না; everyday survival-এর ইতিহাসও। স্যাবা মাহমুদ যেমন দেখিয়েছিলেন, নারীর agency সবসময় উচ্চকণ্ঠ বিদ্রোহের ভাষায় প্রকাশ পায় না; অনেক সময় তা ধৈর্য, বিশ্বাস, যত্ন, নৈতিক দায়িত্ব আর টিকে থাকার শ্রমের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়। হাজেরা সেই রকমই এক চরিত্র। তিনি কোন সিংহাসন উল্টে দেন নি, কোন যুদ্ধও করেন নি। কিন্তু তিনি মরুভূমিতে জীবন টিকিয়ে রেখেছিলেন। আর সেই টিকিয়ে রাখার শ্রমই পরে এক সভ্যতার ভিত্তি হয়ে যায়।
আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য আর সীমান্ত রাজনীতির মধ্যে অসংখ্য নারী সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য ছোটেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, গাজার ধ্বংসস্তূপে, সুদানের শরণার্থী সারিতে, কিংবা ভূমধ্যসাগরের তীরে, আমরা বারবার সেই হাজেরাদেরই দেখি। ইতিহাস সাধারণত তাদের নাম মনে রাখে না। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস এক নারীর সেই দৌড়কে ইবাদত বানিয়ে রেখেছে। সম্ভবত এটাই হজের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি।
আর সম্ভবত এই কারণেই হজ শুধু আধ্যাত্মিক ইবাদত না, স্মৃতিরও এক পুনর্নির্মাণ। মানুষ সেখানে গিয়ে শুধু আল্লাহকে স্মরণ করে না, মানবিক দুর্বলতা, ভয়, ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর নির্ভরতার ইতিহাসও পুনরায় অনুভব করে। ইহরামের সাদা কাপড় মানুষকে সামাজিক পরিচয় থেকে আলাদা করে দেয়; ধনী গরিব, রাজা প্রজা, শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই একই রকম দেখায়। আর সেই সমতার কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছেন হাজেরা, এক নারী, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন ঈমান মানে নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা না; বরং অনিশ্চয়তার মধ্যেও দৌড়াতে থাকা। হয়তো এই কারণেই সাফা মারওয়ার পথ আজও শুধু পাথরের পথ না, মানব অস্তিত্বেরও এক প্রতীক।





