তবে কি উড়ন্ত সসারের ধারণা সত্য হতে চলেছে?

নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরীদের খুব কমই আছেন, যাঁরা সেবা প্রকাশনীর বই পড়েননি। রকিব হাসানের ‘উড়ন্ত সসার’ও বেরিয়েছিল সেবা প্রকাশনী থেকে। তুমুল জনপ্রিয় সে বইয়ের শুরুর দিকটা একটু মনে করিয়ে দিই।
উত্তর দিল্লির বাড়িতে বসে চা খাচ্ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট রঞ্জিত রাঠোর। হঠাৎ একশটি জেট প্লেনের শব্দ নিয়ে অগ্নিগোলকের মতো কিছু একটা ছুটে আসতে দেখলেন তিনি। ভূমিকম্প কি না বুঝতে পারছিলেন না, এদিকে কার্পেট গেছে ওপরে উঠে, দরজা-জানালা খোলা যাচ্ছে না।
পরের খবর হলো, শহরজুড়ে ঝড়ের তাণ্ডব বয়ে গেছে। কিন্তু না! এ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের অধ্যাপক শ্রী স্বদেশ কুমার ত্রিখা জানিয়েছেন, এই ঝড়ের কারণ ইউএফওর আগমন। পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন এক আকাশযানে করে এসেছিল তারা।
শুধু রকিব হাসান নন, ইউএফও বা আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট নিয়ে নানা কল্পকাহিনি আছে।
সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্প ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ থেকে শুরু করে স্পিলবার্গের সিনেমা ‘ইটি’, হিন্দি সিনেমা ‘কোই মিল গয়া’র জাদু বা সাম্প্রতিককালের ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’র রকি, এসবই নির্মিত হয়েছিল মহাজাগতিক প্রাণীর প্রতি মানুষের কৌতূহল বা উৎসাহের কারণে।
ইউএফও নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা তুঙ্গে ওঠে পেন্টাগনের ১৬১টি নথি প্রকাশের পর। কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত এই নথিগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুক্রবার অবমুক্ত করেছে পেন্টাগন। ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুতে বলেছিলেন, ‘প্রচুর আগ্রহ দেখা যাওয়ায়’ তিনি এগুলো প্রকাশ করবেন।
ফাইলগুলো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে এবং আরও ফাইল প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
রোকেয়া কালেকটিভ এ নিয়ে কথা বলেছে বাংলাদেশের জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী ও মহাকাশ গবেষক সৈয়দ আশরাফ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছেন। প্রখ্যাত এই জ্যোতিপদার্থবিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ইউএস নেভাল অবজারভেটরিতে অ্যাস্ট্রোনমার এবং টেক্সাসের ম্যাকডোনাল্ড অবজারভেটরিতে হবি-ইবারলি টেলিস্কোপের রেসিডেন্ট অ্যাস্ট্রোনমার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সৈয়দ আশরাফ বলছিলেন, এখন বিশ্ব বিজ্ঞান গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করছে। মহাজাগতিক প্রাণ নিয়ে ইদানীং অনেক বেশি উৎসাহ এবং গবেষণা চলছে। গত কয়েক বছরে পাঁচ হাজারের বেশি গ্রহই আবিষ্কৃত হয়েছে আমাদের সৌরজগতের বাইরে। তাই প্রাণের বা প্রাণীর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
‘অনেক সৌরগ্রহের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাই প্রাণ থাকার সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি। আমাদের সূর্যের মতো জীবন সৃষ্টিকারী আরও গ্রহ মহাবিশ্বে থাকতেই পারে,’ আশরাফ রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।
ইউএফও কী?
১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে পৃথিবীর আকাশে প্রায়ই দেখা গেছে অজানা, অচেনা উড়ন্ত কোনো বস্তু, যাকে আমরা ইউএফও নামে চিনি। আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট, এমন কিছু যার ব্যাপারে কেউ এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কিছুটা ধরেই নেওয়া হয়, এই অজানা, অচেনা উড়ন্ত বস্তুগুলো পৃথিবীর বাইরের কিছু।
আবার ইউএফও পৃথিবীর বাইরের কিছু নয়, এই অভিমতও রয়েছে অনেকের। তাঁরা বলেছেন, হয়তো ওগুলো পাখি ছিল কিংবা চোখের ভুল।
তবে তা হলে চাঁদে গিয়ে কী করে নভোচারীরা এরকম কিছুর দেখা পেলেন, সেই উত্তরও জানা নেই কারও।
এবারই বলতে গেলে ইউএফওর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করল মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
নথিতে কী আছে?
পেন্টাগন যে ১৬১টি নথি প্রকাশ করে জনসাধারণের দেখার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, তা ‘আগে কখনো না দেখা’ বিষয়। এসব নথিতে পৃথিবীর সাধারণ নাগরিক এবং চাঁদে থাকা নভোচারীদের দেখা ইউএফওর বিবরণ অন্তর্ভুক্ত আছে।
এখন পর্যন্ত এসব ছবিতে গোলাকার, উড়ন্ত, মাঝে মাঝে আলোর ঝলকানি দেওয়া বা দ্রুত ছুটে যাওয়া কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এই ফাইলগুলোর মধ্যে রয়েছে স্টেট ডিপার্টমেন্টের পুরোনো তারবার্তা, এফবিআইয়ের নথি এবং মহাকাশে মানুষবাহী অভিযানসংক্রান্ত নাসার প্রতিলিপি।
ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, ফাইলগুলোতে থাকা তথ্য উন্মুক্ত করা হয়েছে, যেন জনসাধারণ নিজেরাই এই অদ্ভুত বস্তুগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে পারে।
নথিগুলোতে ২০টিরও বেশি ভিডিও ফাইল রয়েছে, যেগুলোতে সিরিয়া ও জাপান থেকে শুরু করে উত্তর আমেরিকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সামরিক সেন্সরের মাধ্যমে ধারণ করা অজ্ঞাত বস্তু দেখা যাচ্ছে। এই বস্তুগুলোর মধ্যে দূর থেকে ধারণ করা দ্রুত চলমান বিন্দুর মতো বস্তু থেকে শুরু করে ২০২২ সালে চীন সাগরের ওপর দেখা একটি ফুটবল আকৃতির বস্তুও রয়েছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ভিডিওটি এ বছরের ১ জানুয়ারির। এতে উত্তর আমেরিকায় কালো পটভূমির বিপরীতে দুটি গোলাকার আলো উড়তে দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয়।
ফাইলগুলোর মধ্যে ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন দর্শনের বিবরণসহ শত শত পৃষ্ঠা রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে থাকা মার্কিন বিমানসেনাদের ১৯৪৮ সালের একটি প্রতিবেদনে বারবার ‘উড়ন্ত সসার’ দেখতে পাওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তাঁদের সুইডিশ সহকর্মীরাও সেগুলো দেখেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, সেগুলো ‘পৃথিবীর পরিচিত কোনো সংস্কৃতি’ থেকে আসেনি।
বেশ কয়েকটি ফাইলে বিগত কয়েক বছরের সামরিক ভিডিও রয়েছে, যেগুলোতে ইরাক, সিরিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভূখণ্ডের ওপরে ছোট ছোট অস্পষ্ট বিন্দুকে চলাচল করতে দেখা গেছে।
তবে এখন কেন এই ফাইলগুলো উন্মুক্ত করা হলো, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছু জানায়নি।
মহাজাগতিক প্রাণের অস্তিত্ব আছে কি নেই?
আমাদের গ্রহের বাইরে প্রাণ যদি থেকেও থাকে, তারা আমাদের কাছে আসবে কী করে? আমাদের মতোই তাঁদেরও কি রকেট আছে?
‘এখন পর্যন্ত সবই কেবল ছবি বা ভিডিও, বা আকাশে দেখতে পাওয়া কিছু আলো,’ রোকেয়া কালেকটিভকে এ ব্যাপারে নিজের অভিমত জানান সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন।
‘এই জিনিসের সিস্টেম, নকশা, কী করে কাজ করে, তার কিছুই আমরা জানি না। ব্যাপারটা রহস্যজনক।’
‘বিজ্ঞান বলে, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। কিন্তু যতক্ষণ না আমরা প্রমাণ পাব, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যাবে না,’ সৈয়দ আশরাফ জানান।
তাঁর মতে, প্রাণের সম্ভাবনা থাকলেই যে উন্নত মহাজাগতিক প্রাণী আছে, সে ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চয়তা নেই। বরং মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো উন্নত প্রাণীর অস্তিত্ব থাকলেই হবে না, আমাদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগের মাধ্যম বা ব্যবস্থা থাকাটাও জরুরি।
এখন তাহলে কী?
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইউএফও নিয়ে গবেষণা অব্যাহত থাকবে। আর আমরাও নতুন নতুন কল্পকাহিনি দেখব সিনেমায়।
ইউএফও দেখা গেছে, এমন দাবি সবচেয়ে বেশি এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ১৯৬০ সাল থেকে ইউএফওসংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ করেছে। তাদের ন্যাশনাল আর্কাইভের ওয়েবসাইটে ক্লিক করে যে কেউ এ সম্পর্কিত তথ্য পেতে পারেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখার ভুল থাকলেও, কোনোটিকে নিয়ে প্রশ্ন আছে।
নথিপত্র বলছে, ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারির ভোরের দিকে ওয়েলসের পেন্টির্চ এলাকায় একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেন, তিনি তাঁর বাড়ির কাছাকাছি একটি মাঠের ওপর ‘আলোর বিশাল পিরামিড’ দেখতে পান।
প্রত্যক্ষদর্শী পরে ওই মাঠে যান এবং দাবি করেন, বস্তুটি মাটির কাছাকাছি নেমে আসে। এরপর সেখান থেকে দুটি বস্তু বেরিয়ে আসে। অল্প সময় পরই একটি সামরিক বিমানবহর ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
একই রাতে স্থানীয় এলাকার বাসিন্দারা দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানান।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা অনুরোধের জবাবে জানায়, ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি ছিল একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ মহড়ার অংশ হিসেবে।
তবে তথ্য অধিকার আইনের ধারা ২৬-এর ব্যতিক্রম দেখিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
আরও কিছু বিষয়ও কিন্তু আছে, যেগুলোকে কেউ কেউ ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে উড়িয়ে দিতে চান। মিসরের কাছেও গোপন কিছু নথি আছে, এমন একটি প্রচার আছে। এই প্রচারের কারণ পিরামিড।
অনেকেই বলার চেষ্টা করেন, পিরামিডের যে নির্মাণশৈলী, তা ওই সময়ের মানুষের পক্ষে তৈরি করা অসম্ভব। এটি আসলে ভিনগ্রহ থেকে আসা প্রাণীদের কাজ। যদিও প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বলেছেন, পিরামিড যাঁরা বানিয়েছিলেন, তাঁদের নিদর্শন এখনো আছে। ইউএফওর কোনো কৃতিত্বই নেই এতে।
তবে ২০২০ সালে গিজার পিরামিডের ওপর ইউএফও দেখা গিয়েছিল। এ নিয়ে তখন অনেক প্রতিবেদনও বেরিয়েছিল।
যুক্তরাজ্য বা মিসর তারাও ইউএফও নিয়ে নতুন কিছু প্রকাশ করে কি না, তা দেখার আশায় আছেন এখন অনেকে।
সৈয়দ আশরাফ বলছিলেন, তিনি আশা করেন, মহাবিশ্বে উন্নত কোনো প্রাণী যদি থেকেও থাকে, তবে তাঁরা মানুষের বন্ধুই হবে, শত্রু নয়।
তিনি আশাবাদী যে মহাজাগতিক প্রাণীরা আমাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তবে সেটা জানার জন্য মানুষের এখন প্রয়োজন তাঁদের অস্তিত্বের প্রমাণ।





