ছাত্রী হলে আতঙ্কের মধ্যেই সাপে কাটলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রকে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপের উপদ্রব নিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ছাত্রী হলগুলোতে আতঙ্ক ছিলই। এর মধ্যেই গত বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আহত শিক্ষার্থীর নাম আশরাফুল আলম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রী হলসংলগ্ন সড়কে একটি বিষধর সাপ তাকে দংশন করে। সে সময় আশরাফুল ছাত্র পড়িয়ে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন।
রোগীর সঙ্গে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, “রাতেই তাকে দ্রুত হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।”
এর আগে গত ১৫ জুন দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব ফয়জুন্নেসা হলের লাইব্রেরি কক্ষ থেকে একটি অজগরের বাচ্চা উদ্ধার করা হয়।
নির্বিষ ওই সাপটি উদ্ধার করেন সাপ উদ্ধারকারী সংগঠন সোসাইটি ফর স্নেকস অ্যান্ড স্নেকবাইট অ্যাওয়্যারনেস (থ্রিএসএ)-এর সদস্যরা। সাপটি নির্বিষ হলেও সেটি দেখার পর পুরো হলজুড়ে ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় প্রজাতির বিষধর সাপ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ভেনম রিসার্চ সেন্টার, বাংলাদেশের গবেষক রফিকুল ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অন্তত ছয় প্রজাতির বিষধর সাপের উপস্থিতি রয়েছে।
এসব হলো সবুজ বোড়া (গালটাওয়া বা কচুসাপ), বড় কালকেউটে (কালান্তর বা কৃষ্ণ কালাচ), শঙ্খিনী (দুমুখো সাপ, হানাই সাপ বা সানি সাপ), পদ্মগোখরা (ফুলজোড়া, পানক সাপ বা কেউটে), লালঘাড় ঢোঁড়াসাপ এবং শঙ্খচূড় (রাজগোখরা, কালা জামুড়া বা আইরাজ)।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে প্রায়ই সাপের দেখা মিললেও সর্পদংশনের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাঁদের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে দ্রুত অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) সহ-ছাত্রীকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদাউস রিতা বলেন, “চবি ক্যাম্পাসকে সাপের হাব বলা যায়। এখানে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা সাপের দংশনের শিকার হন। তাই ক্যাম্পাসের মেডিকেল সেন্টারে সাপে কাটার সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। নয়তো যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্র মজলিসের সভাপতি সাকিব মাহমুদ রুমী ফেসবুকে লিখেছেন, “এই ক্যাম্পাসে জরুরি অক্সিজেন সেবা, অ্যান্টিভেনমসহ সব ধরনের সুবিধা একদিন হয়তো হবে। কিন্তু তার আগে দুই-একজনকে জীবন দিতে হতে পারে। তাছাড়া চাকসু বা প্রশাসন কেউই আপাতত বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা (চিফ মেডিকেল অফিসার) ডা. মোহাম্মদ আবু তৈয়ব বলেন, সর্পদংশনের চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণের জন্য আলাদা অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমাদের মতো ছোট মেডিকেল সেন্টার বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনেক ক্ষেত্রেই অ্যান্টিভেনম দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সময় রোগীর তীব্র অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া হয়ে শকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন রোগীকে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দিতে হয়, যা আমাদের এখানে নেই। এ ধরনের চিকিৎসার জন্য আলাদা সেটআপ ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন।”
সাপে কামড়ালে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ভেনম রিসার্চ সেন্টার, বাংলাদেশের গবেষক রফিকুল ইসলাম রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, সবুজ বোড়া, বড় কালকেউটে, পদ্মগোখরা ও শঙ্খচূড়ের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে এবং অন্তত ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
বিষক্রিয়ার লক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, “বিষক্রিয়া হলে বমি বমি ভাব, চোখের পাতা নেমে আসা, ঘাড় হেলে পড়া, জড়িয়ে কথা বলা এবং শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ সময় রোগীকে কিছু খেতে দেওয়া যাবে না, ঘুমাতে দেওয়া যাবে না। ক্ষতস্থানে বাঁধ দেওয়া বা কাটাছেঁড়া করা যাবে না।”





