ঢাবিতে নারী শিক্ষার্থীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি: কার্যকর হবে যেভাবে

আরিফ হোসাইন
ঢাবিতে নারী শিক্ষার্থীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি: কার্যকর হবে যেভাবে
ছবি: ইন্টারনেট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী সুমি আক্তার পড়াশোনার সময় ‘মা’ হয়েছেন। কিন্তু মা হতে গিয়ে তিনি শিক্ষাজীবনে এক বছর পিছিয়ে পড়েছেন। কারণ, এ সময় তিনি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ফলে ওই বছর তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।

সুমি রোকেয়া কালেক্টিভকে বলেন, “আমি মা হই ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে। ওই সময়ে আমি মাস্টার্সে ভর্তি হই। সদ্য মা হওয়ায় প্রায় তিন মাস ক্লাস করতে পারিনি। এই তিন মাস উপস্থিত না থাকার কারণে আমি পরীক্ষায় বসতে পারিনি। ফলে আমাকে মাস্টার্সে এক বছর গ্যাপ দিতে হয়েছে। প্রথম দুই-তিন মাস একটু বিশ্রামের সুযোগ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই পুরো এক বছর আমাকে বাসায় থাকতে হয়েছে। আমার মানসিক সংগ্রাম, পিছিয়ে পড়া, সহপাঠীদের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে আমি প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি চাই না আমার সঙ্গে যা হয়েছে, তা আমার অনুজদের সঙ্গে হোক। আমি চাই, যারা ভবিষ্যতে মা হবেন, তারা যেন মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা পান।”

সুমির মতো যেসব নারী শিক্ষার্থী পড়াশোনার সময় মা হচ্ছেন, তাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি ও কিছু সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৫ জানুয়ারি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সভাপতিত্বে ডিনস কমিটির এক সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এখনো ছুটি ও সুবিধা কার্যকর করার জন্য কোনো নীতিমালা তৈরি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ ও শাখাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আলোচনায় এসেছে, ছুটি কেবল এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতে পারে। তবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ন্যূনতম উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা শিথিল করা এবং ল্যাব বা ব্যবহারিক ক্লাসে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।

ডিনস কমিটির সভায় নারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে ডাকসু প্রতিনিধিদের একটি আবেদন পর্যালোচনা করে উপস্থাপন করা হয়। এটি উপস্থাপন করেন ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন। তিনি বলেন, “সুপারিশগুলো বাস্তবসম্মত এবং আমি একমত পোষণ করি। তবে শিক্ষাকালীন সময়ে (এমফিল ও পিএইচডি ছাড়া) মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রদান সম্ভব নয়।”

পরে সভায় নারী শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে পরীক্ষার জন্য উপস্থিতির শর্ত শিথিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির সভায় তাদের দাবিগুলো পর্যালোচনা করে যৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়েছে। এ কারণে উপাচার্যের উপস্থিতিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানান, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে সব বিভাগের চেয়ারম্যান ও ইনস্টিটিউট পরিচালকদের কাছে এই সিদ্ধান্তের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে এবং এটি কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ জানান, ডিনস কমিটির সিদ্ধান্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছে, যা পরে বিভিন্ন অনুষদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

কেন এই সিদ্ধান্ত

গর্ভাবস্থায় একজন নারীকে কিছুক্ষণ পরপর বসা থেকে উঠতে হয়, হাঁটাচলা করতে হয়, বারবার ওয়াশরুমে যেতে হয় এবং পানি পান করতে হয়। অন্যথায় যেকোনো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ফলে এই সময়ে সব ক্লাসে উপস্থিত থাকা বা তিন-চার ঘণ্টার পরীক্ষায় বসা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক উম্মে সালমা বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তবে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ ছিল না। ডাকসুর পক্ষ থেকে বিষয়টি উপস্থাপন করার পর প্রশাসন এটি পর্যালোচনা করে ডিনস কমিটির সভা ডাকে। সভায় সাইকোলজিস্ট ও আইন বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, মাতৃত্বকালীন সময়ে বাধ্যতামূলক ৭০ শতাংশ উপস্থিতির নিয়ম শিথিল করা হবে। অর্থাৎ উপস্থিতি কম হলেও শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। তবে অনুপস্থিতির জন্য তাদের ১ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে।

কীভাবে কার্যকর, ভারতে কী হয়

বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া তাবাসসুম নিশাত বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটির ঘোষণা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। অনেক নারী শিক্ষার্থী বিবাহিত হওয়ায় গর্ভকালীন সময়ে নিয়মিত ক্লাস করতে পারেন না। ফলে তাদের উপস্থিতি কমে যায় এবং তারা পরীক্ষায় বসতে পারেন না। এই সুবিধা চালু হলে তারা নিজেদের সুবিধামতো প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।

এ ছাড়া সন্তান জন্মের পর নবজাতকের বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে, ফলে এ সময়ও ক্লাস করা কঠিন হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় এই ছুটি তাদের জন্য সহায়ক হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও নারী শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পান। মহাত্মা গান্ধী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে অনার্স ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু হয়েছে।

এই ক্ষেত্রে ছুটির কারণে কোনো শিক্ষার্থী যদি সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারেন, তাহলে পরবর্তী সেমিস্টারের সঙ্গে তা সমন্বয় করা হয় সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানের তত্ত্বাবধানে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত নীতিমালা হয়নি। ফলে ছুটির মেয়াদ ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি এখনো নির্ধারিত হয়নি।

যেসব শিক্ষার্থীর ল্যাব বা ব্যবহারিক ক্লাস নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা বাস্তবায়নে তেমন সমস্যা হবে না বলে মনে করছে প্রশাসন। তবে বিজ্ঞান অনুষদের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা থাকতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুস সালাম বলেন, যেসব নারী শিক্ষার্থীর মাতৃত্বকালীন ছুটির প্রয়োজন হবে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সুবিধাজনক উপায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।