ঋতুস্রাব কি অপবিত্র বা বিপজ্জনক

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
ঋতুস্রাব কি অপবিত্র বা বিপজ্জনক
ছবি: প্রতীকী

ঋতুস্রাবের রক্ত সাধারণ রক্ত ও টিস্যু দিয়ে গঠিত, এতে বিশেষ বা বিপজ্জনক কোনো উপাদান নেই। তবুও ঐতিহাসিকভাবেই বহু সমাজে এমন বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে ঋতুমতী নারীর উপস্থিতি গাছপালা, খাবার বা গবাদিপশুর ক্ষতি করতে পারে। ১৯৩০-এর দশকে পশ্চিমা কিছু বিজ্ঞানী ধারণা দিয়েছিলেন যে ঋতুমতী নারীদের শরীরে “মেনোটক্সিন” নামে একধরনের বিষ তৈরি হয়।

আজও অনেক মানুষ একই ধরনের বিশ্বাস পোষণ করেন। কিছু সমাজে মনে করা হয়, ঋতুস্রাবের সময় নারী ও কিশোরীরা অমঙ্গল বা অপবিত্রতা ছড়াতে পারে। এর ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়। যেমন— ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারা, উপাসনালয়ে যেতে না দেওয়া, খাবার স্পর্শ করতে নিষেধাজ্ঞা বা ঘরের ভেতরে ঘুমাতে না দেওয়া।

পশ্চিম নেপালে “ছাউপাদি” নামে একটি প্রথায় ঋতুমতী নারী ও কিশোরীদের রান্না করতে নিষেধ করা হয় এবং তাদের বাড়ির বাইরে, প্রায়ই ছোট কুঁড়েঘর বা গবাদিপশুর ঘরে রাত কাটাতে বাধ্য করা হয়। ভারতের কিছু অঞ্চল ও অন্যান্য দেশেও একই ধরনের নিয়ম রয়েছে। ইথিওপিয়ার একটি গ্রামীণ এলাকায় ঋতুস্রাব নিয়ে কুসংস্কারের কারণে নারী ও কিশোরীদের শুধু ঋতুস্রাবের সময় নয়, সন্তান জন্মদান ও প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণের সময়ও বাড়ি থেকে আলাদা রাখা হতো।

এই ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া নারী ও কিশোরীদের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, এমনকি প্রাণঘাতীও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নেপালে অনেক নারী ও কিশোরী প্রচণ্ড ঠান্ডা, বন্য প্রাণীর আক্রমণ কিংবা যৌন সহিংসতার ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।

তবে উল্লেখ করা জরুরি যে এসব প্রথার সব দিকই নেতিবাচক নয়। কিছু জায়গায় ঋতুস্রাবের সময় নারীদের কাজ থেকে বিরতি দেওয়া হয়, যেন নারীরা বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন।

ঋতুস্রাব নিয়ে কুসংস্কার নারীদের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনাকেও প্রভাবিত করে। কিছু সংস্কৃতিতে ঋতুস্রাবের সময় নারী ও কিশোরীদের যৌনাঙ্গ পরিষ্কার করতে নিষেধ করা হয়, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আফগানিস্তানের কিছু অঞ্চলে বিশ্বাস করা হয়, ঋতুস্রাবের সময় গোসল করলে বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। অন্য কোথাও নারীরা ভয় পান যে তাদের শরীর পানি বা টয়লেট অপবিত্র করে ফেলবে।

এই বিশ্বাসগুলো ঋতুস্রাবের সামগ্রী ফেলার পদ্ধতিকেও প্রভাবিত করে। কোথাও নারীরা স্যানিটারি প্যাড পুড়িয়ে ফেলেন, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে এতে পশু বা প্রকৃতির ওপর অভিশাপ নেমে আসতে পারে। আবার কোথাও মনে করা হয়, ঋতুস্রাবের সামগ্রী পোড়ালে বন্ধ্যাত্ব হতে পারে। কিছু সমাজে বিশ্বাস করা হয়, এসব সামগ্রী মাটিতে পুঁতে না রাখলে দুষ্ট আত্মা আকৃষ্ট হতে পারে। আবার কোথাও ধারণা আছে, সঠিকভাবে না ফেললে একটি মেয়ের সারাজীবন অবিরাম ঋতুস্রাব হতে পারে।

মিথ: ঋতুস্রাবের সময় কিছু খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ

অনেক সমাজে বিশ্বাস করা হয়, ঋতুমতী নারী ও কিশোরীরা টক, ঠান্ডা বা সহজে নষ্ট হয় এমন খাবার খেতে পারে না। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো খাদ্য নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি নেই। বরং এ ধরনের বিধিনিষেধ পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মিথ: ঋতুস্রাব মানেই বিয়ে ও যৌনতার জন্য প্রস্তুত

বিশ্বের বহু স্থানে একটি মেয়ের প্রথম ঋতুস্রাব বা মেনার্কিকে বিয়ে, যৌন সম্পর্ক ও সন্তান ধারণের উপযুক্ত হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে অনেক মেয়ে শিশুবিবাহ, যৌন সহিংসতা, জবরদস্তি বা অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকিতে পড়ে।

যদিও ঋতুস্রাব জৈবিকভাবে প্রজননক্ষমতার একটি লক্ষণ, এটি মানসিক, আবেগিক, মনস্তাত্ত্বিক বা শারীরিক পরিপক্বতার প্রমাণ নয়। কিছু ক্ষেত্রে সাত বা আট বছর বয়সেও মেনার্কি হতে পারে। এমনকি বয়সে বড় কিশোরীরাও বিয়ে, যৌনতা বা মাতৃত্ব সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো পরিপক্ব নাও হতে পারে।

মিথ: ঋতুস্রাব নারীদের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়

অনেক সময় মনে করা হয়, ঋতুস্রাব নারীদের শারীরিক বা মানসিক সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। উনবিংশ শতাব্দীর কিছু চিকিৎসক পর্যন্ত বলেছিলেন যে ঋতুস্রাব নারীদের “দায়িত্বশীল মানুষ” হিসেবে বিবেচনা করাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজও একই ধরনের ধারণা বিদ্যমান।

নারীরা প্রায়ই এমন অপমানজনক মন্তব্যের শিকার হন যে ঋতুস্রাব তাদের আবেগ বা আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে তাদের নেতৃত্ব বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হতে পারে।

মিথ: ঋতুস্রাবের সময় সব নারীই খিটখিটে মেজাজের হন

ঋতুচক্র হরমোনজনিত পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এই পরিবর্তনের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। কিছু নারীর ক্ষেত্রে মেজাজের পরিবর্তন হতে পারে, আবার অনেকের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের মানসিক পরিবর্তন দেখা যায় না।

মিথ: ঋতুস্রাব শুধু নারীদের বিষয়

ঋতুস্রাব নারী ও কিশোরীদের শরীরে ঘটে, পাশাপাশি নন-বাইনারি ও ট্রান্স ব্যক্তিদের মধ্যেও হতে পারে। তবে ঋতুস্রাবসংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যা মূলত মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়, তাই এটি পুরো সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এর অর্থ হলো, লিঙ্গ সমতা, ইতিবাচক পুরুষত্বের ধারণা এবং ঋতুস্রাব নিয়ে বিদ্যমান কলঙ্ক ও বৈষম্য দূর করার আলোচনায় পুরুষ ও ছেলেদেরও অংশ নিতে হবে।

সূত্র : ইউএনএফপিএ

২৮ মে মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন ডে হিসেবে পালিত হয়