“মা বেহেন” : একটা হাতকাটা ব্লাউজ আর সমাজের আয়না

বিনোদনমূলক এক অনুষ্ঠানের নারী উপস্থাপক পর্দায় হাতকাটা পোশাক পরেছিলেন। একজন ‘সচেতন’ ফেসবুক ব্যবহারকারী তাঁর উন্মুক্ত কাঁধ ও বাহু শাড়ি দিয়ে ঢেকে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে নারীর পোশাক নিয়ে কিছু নীতিবাক্যও ঝাড়েন। নারী উপস্থাপকদের ফেসবুক লাইভে ফুল স্লিভ সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি পরার নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশ বেতারও সে সময় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। চাপের মুখে নির্দেশটি প্রত্যাহার করা হয়।
কিন্তু হাতকাটা পোশাকে এত ভয় কেন?
নেটফ্লিক্সের ‘মা বেহেন’ সিনেমার কেন্দ্রেও ঠিক এই একই প্রশ্ন। সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাধুরী দীক্ষিত, তৃপ্তি ডিমরি, ধর্না দুর্গা এবং হাতকাটা ব্লাউজ।
সুরেশ ত্রিবেণী পরিচালিত এই সিনেমায় মাধুরী দীক্ষিতের চরিত্র রেখার হাতকাটা ব্লাউজের দিকে সবার চোখ আটকে থাকে। প্রথম দেখায় মানুষ তাঁর খোলা কাঁধ ও উন্মুক্ত বাহুর দিকে তাকায় এবং তাঁর চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, পরিচয়, সর্বোপরি উদ্দেশ্য নিয়ে মনগড়া রায় দিয়ে দেয়। রেখা একজন একা মা। স্বামী নেই, মাথায় সংসারের বোঝা, দুই মেয়েকে মানুষ করার তাগিদ। তবু তাঁর অস্তিত্বের মানচিত্র আঁকা হয় তাঁর পোশাক দিয়ে।
‘মা বেহেন’ শহরতলির ভিড় আর কোলাহলে গায়ে গায়ে লেগে থাকা ছোট ছোট বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা একটি কলোনির গল্প।
কিন্তু ধীরে ধীরে এই কলোনি ভারতীয় উপমহাদেশের সামগ্রিক সমাজব্যবস্থার চিত্র হয়ে ওঠে। সেটা গ্রাম হোক, শহরতলি হোক কিংবা হালের ফেসবুক।
ছবিটির নামের মধ্যেই আছে বিদ্রোহের প্রথম সংকেত। ‘মা বেহেন’ শব্দটি নিয়ে খেলা চলে অনেক। ভদ্রলোকেরা মুখে মা-বোনের কথা বলে ফেনা তুলে ফেলেন, আবার সময়-সুযোগমতো এই শব্দকেই জঘন্য গালিতে পরিণত করেন। এই নামটি বেছে নেওয়ার মাধ্যমে পরিচালক সরাসরি সেই সমাজকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, যে সমাজ স্বাধীন নারীকে সব সময় দাঁড়িপাল্লায় মাপতে থাকে।
ছবির তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম রেখা, জয়া আর সুষমা। নামগুলো শুনলেই একটি বিশেষ প্রজন্মের ভারতীয়রা গেয়ে ওঠেন, ‘সবকি পসন্দ নির্মা’। দূরদর্শন যুগের নির্মা ওয়াশিং পাউডারের সেই বিজ্ঞাপনে এই নামগুলো ছিল ‘আদর্শ ভারতীয় নারী’র প্রতীক। সেই বিজ্ঞাপনের নারীরা ছিলেন নিষ্কলুষ, বাধ্য, সর্বদা হাসিমুখ। কিন্তু ‘মা বেহেন’-এর রেখা, জয়া আর সুষমা সেই সংজ্ঞাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। নির্মার রেফারেন্সটি একটি বিদ্রূপের মতো ছবি জুড়ে ঝুলে থাকে।
সমাজ এখনো এই নারীদের নিষ্কলুষ ও বাধ্য হিসেবে দেখতে চায়। রেখার বড় মেয়ে জয়া সেই জীবন বেছেও নেয়। যে জীবন অনবরত রুটি বেলার আর জীবনের প্রতি মুহূর্তের হিসাব শ্বশুরমশায়ের হাতে তুলে দেওয়ার। কিন্তু কেবল পুরুষের ঘাম-দাগ ঘষে তোলার জীবনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেই এই নারীরা বেঁচে আছে।
রেখার একা মা হিসেবে জীবনযাপনের চেষ্টা এবং হাতকাটা ব্লাউজ পরা, দুটোই দেখানো হয়েছে তাঁদের চোখ দিয়ে, যারা একজন একা নারীর সফল হওয়ার ধারণাটাই মেনে নিতে পারে না। এই সমাজের চোখে একজন বিধবা যদি হাতকাটা ব্লাউজ পরেন, তিনি ‘চরিত্রহীনা’; যদি একা সংসার চালান, তিনি ‘পতিতা’; যদি মাথা উঁচু করে বাঁচেন, তিনি ‘ডাইনি’।
ডার্ক কমেডি ঘরানার সিনেমাটির স্তরে স্তরে বোনা হয়েছে ব্যবস্থাগত অসমতা, নারীবিদ্বেষ, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের নামে পীড়নের সেই চিরচেনা গল্প। রেখা ‘সমাজচ্যুত’, কলোনির মানুষ তাঁকে প্রায় নির্বাসিত করে রেখেছে। সেই কলঙ্ক তাঁর মেয়ে জয়া ও সুষমা বড় হওয়ার পরও তাঁদের পিছু ছাড়েনি। মেয়েরাও মায়ের থেকে দূরে দূরে থাকতে চায়।
কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তাঁদের শিখিয়েছে, যে মা নিজের শর্তে চলেন, সে মায়ের কাছে থাকলে সম্মান থাকবে না। এমনকি জয়ার বিয়েটাও হয় এই শর্তে।
মাধুরী দীক্ষিত এবং তৃপ্তি ডিমরি, দুজনই নিজ নিজ সময়ে জাতির ‘সুইটহার্ট’ তকমা বাগিয়েছেন। পর্দায় নায়কের বাহুলগ্না হয়ে যৌন পণ্যায়নের বিষয়বস্তু হয়েছেন বারবার। কিন্তু এই মাধুরী আর তৃপ্তি এই সিনেমায় ‘মেল গেজ’-কে চ্যালেঞ্জ করেছেন চলচ্চিত্রিক বয়ানের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সুষমা চরিত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ধর্না দুর্গার অভিনয়ও উপযুক্ত মনে হয়েছে।
সিনেমাটি নিখুঁত নয়। একটি নির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সময়ই সিনেমার প্লট খেই হারিয়েছে, চরিত্রগুলো নিজেদের চালাকির আতিশয্যে মেতেছে। তবে যে কথাটা বলতে চেয়েছে, সেটা বলেছে। আর সেটা বলা দরকার ছিল।
বাংলাদেশ বেতারের ড্রেস কোড বিতর্ক থেকে ‘মা বেহেন’-এর রেখার হাতকাটা ব্লাউজ, সূত্রটা একই। নারীর দেহ, নারীর সম্মান আর নারীর পোশাকের এজেন্সি ব্যক্তি নারীর হাতেই। সমাজ বা পুরুষের হাতে নয়।
হাসতে হাসতে সমাজকে সেই আয়না দেখানোই এই ছবির সবচেয়ে বড় সাফল্য। নির্মার ‘সবার পছন্দ’ হয়ে উঠতে চাওয়া মেয়েরা এখন আর ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হতে রাজি নয়।





