ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’—কিন্তু কোথায়? কেন পর্দায় নেই বাংলার দেশভাগ

দেশভাগ আমাদের সামষ্টিক অবচেতনের গভীরে থাকা পুরোনো ক্ষত, যেখানে আমরা বারবার হাত বুলাই। ইংরেজিতে একটি শব্দযুগল রয়েছে—‘ফ্যান্টম লিম্ব’। বাংলায় যার অর্থ ‘অশরীরী অঙ্গ’। দেহের এমন একটি অংশ, যা আমরা হারিয়েছি, কিন্তু এখনো ক্রমাগত ও স্পষ্টভাবে তার উপস্থিতি অনুভব করি। দেশভাগ অনেক মানুষের জন্য ‘ফ্যান্টম হোম’ বা সেই ‘অশরীরী ঘর’-এর অনুভূতির নাম, যা নেই, তবু তীব্রভাবে আছে। ইমতিয়াজ আলীর নতুন সিনেমা ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’ সেই ঘরের কথাই বলে।
৯৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ সব ভুলে যান। কিন্তু তিনি জানেন, তাঁকে সারগোদায় ফিরে যেতে হবে। খুব জরুরি। সীমান্তরক্ষীরা তাঁকে আটকায়। বলে, ওটা তো অন্য দেশ! সেই যে দেশ ভাগ হয়ে দুটি দেশ হলো। আসলে তিনটি দেশ। তৃতীয় এই দেশটির কথা কারও মনে পড়ে না। এটাও মনে পড়ে না যে দেশভাগ মানেই শুধু পাঞ্জাবের বিভাজন নয়।
দেশভাগের যে ছবি রুপালি পর্দায় বারবার ফিরে আসে, তা প্রায় সব সময়ই পাঞ্জাবের। অথচ ১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ লাইন বাংলাকেও ভাগ করেছিল। পদ্মার ওপারে ফেলে আসা ঘর, বরিশালের নদী, ময়মনসিংহের মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর স্মৃতির কোনো রিলস নেই। তাঁদের নিয়ে কোনো ভাইরাল স্ট্যাটাসও চোখে পড়ে না। কারণ, তাঁদের গল্পগুলো মূলধারার চলচ্চিত্রে কেন যেন জায়গা করে নিতে পারে না।
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘সাবঅল্টার্ন কি কথা বলতে পারে?’ তিনি বলতে চাননি যে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর নেই। বরং তিনি বলেছেন, কণ্ঠস্বর থাকলেই হয় না; সেই কণ্ঠস্বর আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাতে একটি কাঠামো লাগে, একটি প্রতিষ্ঠান লাগে, সেই কথা শোনার মতো সমঝদার শ্রোতা লাগে। সেই কাঠামো না থাকলে কথা যতই বলা হোক না কেন, তা ভাষা হয়ে ওঠে না। বাংলার দেশভাগের বেদনা ঠিক এই জায়গাতেই আটকে আছে। সেই বেদনার আর্তি লক্ষ লক্ষ মানুষের বুকে, শরণার্থীশিবিরে, কলকাতার ফুটপাতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কিন্তু তার প্রতিধ্বনি শোনার জন্য যে সাংস্কৃতিক কাঠামো দরকার ছিল, তা কখনো গড়ে ওঠেনি।
অনিল শর্মা পরিচালিত সুপারহিট বাণিজ্যিক ছবি ‘গদর’-এর কথাই ভাবুন। ১৯৪৭ সালের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই সিনেমায় দেশভাগের বেদনার চেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা। শিখ তারা সিং দাঙ্গায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মুসলিম সাকিনাকে উদ্ধার করেন, আশ্রয় দেন এবং একসময় তাঁরা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পাকিস্তানে গেলে সাকিনাকে তাঁর পরিবার আটকে রাখে। সিনেমার মূল কাহিনি আবর্তিত হয়, কীভাবে তারা সিং তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন, তা নিয়ে। পরিচালক নিজেই বলেছিলেন, সিনেমাটি তাঁর কাছে ‘রামায়ণ’, আর পাকিস্তান হলো লঙ্কা, যেখান থেকে রাম তাঁর সীতাকে উদ্ধার করে আনেন।
এই রূপক স্পিভাকের বিশ্লেষণের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। যে কণ্ঠস্বর পর্দায় আসে, তাকে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক কাঠামোর ভেতর দিয়েই আসতে হয়। পাঞ্জাব ভাগ হওয়ার শোক পর্দায় জায়গা পায় ঠিকই, কিন্তু দর্শকের কাছে হাজির হয় জাতীয়তাবাদী বয়ানের মোড়কে। খেটেখাওয়া প্রান্তিক মানুষের স্মৃতি ও বেদনার কথা আমরা শুনতে পাই বটে, কিন্তু সেই কথা অনুসরণ করে কেন্দ্রের ভাষা। ‘গদর’-এর পাঞ্জাবি শরণার্থী যখন পর্দায় কাঁদেন, তখন সেই কান্না হলভর্তি দর্শকের কাছে পৌঁছে যায়। কারণ, সেই কান্না শেষ পর্যন্ত ভারতমাতার বয়ান হয়ে ওঠে। বাংলার শরণার্থীর কান্নার সেই বয়ানে মিশে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ সেই কান্নার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা তৈরি হয়নি। বাংলা এখনও দূরের।
ইমতিয়াজ আলি এই প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ‘গদর’-এর জাতীয়তাবাদী উত্তাপ থেকে সরে এসে তিনি শুধু এক বৃদ্ধের ঘরে ফেরার আকুতির ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু ভারতের মূলধারার চলচ্চিত্রশিল্প দশকের পর দশক ধরে গল্প বলার যে কাঠামো তৈরি করেছে, তা কেন্দ্র বা ক্ষমতাসীন ভারত সরকারের মতাদর্শকে একরকম অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছে। দর্শকও সেই মতাদর্শের ভেতর দিয়েই গল্প গ্রহণ করে? ইমতিয়াজের গল্প বলার এই নতুন ধারার সঙ্গে তারা খাপ খাইয়ে নিতে পারবে তো?
অমৃতা প্রীতমের উপন্যাস ‘পিঞ্জর’-এর চলচ্চিত্রায়ন স্পিভাকের বিশ্লেষণের আরেকটি স্তর স্পর্শ করে। স্পিভাক তাঁর প্রবন্ধে বিশেষভাবে বলেছেন, নিম্নবর্গের ভেতরে নারী আরও গভীরভাবে নিম্নবর্গ। ‘পিঞ্জর’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র পুরো ১৯৪৭-এর দাঙ্গায় অপহৃত হন। ধীরে ধীরে নিজের নাম, ধর্ম, পরিচয় ও দেশ হারিয়ে ফেলতে থাকেন। এক পর্যায়ে এই ট্র্যাজেডি কেবল একজন নারীর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি থাকে না। সেটি স্পিভাকের সেই পর্যবেক্ষণের চলচ্চিত্রিক রূপ হয়ে ওঠে। দেশভাগের ইতিহাসে নারীর শরীর একটি লেখার পাতায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে সম্প্রদায়ের সম্মান ও অসম্মান—দুটোই লেখা হয়েছে। কিন্তু নারী কখনো সেই লেখক নন; তিনি শুধুই পাতা। পুরোর কণ্ঠস্বর আছে ‘পিঞ্জর’-এ, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর কার ভাষায় কথা বলে? পুরুষতান্ত্রিক সমাজের লেখা একটি আখ্যানের ভেতরেই তিনি বারবার বন্দী হন।
সাদত হাসান মান্টো এই বন্দিত্বটিই সবচেয়ে ভালো বুঝেছিলেন। সে কারণেই তিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক’ লেখকদের একজন হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। ‘খোল দো’ গল্পের সেই মেয়েটি কথা বলে না, শুধু শরীর দিয়ে সাড়া দেয়। আর সেই সাড়ার ভেতরে যে সত্য রয়েছে, তা কোনো বয়ানে ধরা যায় না। মান্টো বুঝেছিলেন, নিম্নবর্গের প্রকৃত অভিজ্ঞতা ক্ষমতাসীনদের ভাষায় অনূদিত হয় না। সেই চেষ্টা করতে গেলে কিছু না কিছু সব সময় হারিয়ে যায়। ‘টোবা টেক সিং’-এর বিশন সিং কথা বলেন, কিন্তু কেউ তাঁকে বোঝে না। শেষ পর্যন্ত তিনি দুই দেশের ভাষার বাইরে, দুই রাষ্ট্রের মানচিত্রের বাইরে, নো-ম্যানস ল্যান্ডে মরে পড়ে থাকেন। মান্টো যেন বলতে চেয়েছেন, যার কথা কেউ শোনে না, সে শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের নাগরিকের মর্যাদাও পায় না।
নিজ দেশ, নিজ শহর ছেড়ে মান্টোকে লাহোরে যেতে হয়েছিল। সেখানেই মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি সব সীমানা, ক্ষমতা ও বয়ানের ঊর্ধ্বে চলে যান। কিন্তু তাঁর গল্পগুলো আজও বেঁচে আছে। কারণ, তিনি সেই সত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন, যার জায়গা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নেই।
ঋত্বিক ঘটক বাংলার দেশভাগের ক্ষেত্রে ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’-য় তিনি পূর্ববঙ্গের বিভাজনের যন্ত্রণা এঁকেছিলেন। নীতার সেই চিৎকার, ‘দাদা, আমি যে বাঁচতে বড় ভালোবাসি’, যেন পূর্ববঙ্গের মেয়েটির কণ্ঠে সমগ্র বাংলার বেঁচে থাকার আর্তনাদ। কিন্তু ঋত্বিকের কথা কি পৌঁছেছিল? স্পিভাক বলেছিলেন, কথা বলাটাই যথেষ্ট নয়; শোনাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর শোনার জন্য ক্ষমতার একটি কাঠামো লাগে। ঋত্বিকের ছবি সেই কাঠামোর বাইরে পড়ে গিয়েছিল। বাংলার নিম্নবর্গ কথা বলেছিল তাঁর ছবিতে, কিন্তু সেই কথা শোনার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কান দরকার ছিল, তা ছিল না।
এই ভুলিয়ে দেওয়াটা নিরীহ নয়। স্পিভাক ‘এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স’-এর কথা বলেছেন। প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর সংস্কৃতি যখন নিজের দর্শনকে নিরপেক্ষ সত্য হিসেবে আরোপ করে। প্রায়ই সে অন্যের দর্শনকে খারিজ করে দেয়। এই খারিজ করে দেওয়াই হলো এপিস্টেমিক ভায়োলেন্স বা জ্ঞানতাত্ত্বিক সহিংসতা। নিম্নবর্গের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা জীবনভঙ্গিকে পদ্ধতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়, চুপ করিয়ে দেওয়া হয় কিংবা মুছে ফেলা হয়। আর এই প্রক্রিয়ায় তাদের অস্তিত্বকেই মুছে ফেলা হয়। বাংলার দেশভাগের চলচ্চিত্রিক অদৃশ্যতা সেই সহিংসতারই একটি রূপ।
সামাজিক মাধ্যমে ‘ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা’-র রিলস, ভিডিও দেখে বা হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখে মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠছেন। অনেকের জন্যই এই সিনেমা দেশভাগের প্রজন্মান্তরের ক্ষতকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু বরিশালের সেই বৃদ্ধের রিলস কেউ বানাচ্ছে না, যিনি ভারতে বসে শেষ পর্যন্ত নিজের ভিটার জন্য কেঁদেছেন। কারণ, সেই কান্না শোনার জন্য কোনো অ্যালগরিদম তৈরি হয়নি, কোনো বাজার তৈরি হয়নি, কোনো সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি হয়নি। নিম্নবর্গ কথা বলতে পারে, কিন্তু ফেসবুক ফিডের ফিল্টারে তা বাদ পড়ে যায়।
সেই প্রতিশ্রুতি, ‘আমি ফিরে আসব’, পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য এখনো কেউ উচ্চারণ করেনি। আর যত দিন না সেই কথা বলার এবং শোনার কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তত দিন স্পিভাকের প্রশ্নের উত্তর একটাই থেকে যায়—না, এই সাবঅল্টার্ন এখনো কথা বলতে পারে না।





