সরকার বাহাদুর বনলতা এক্সপ্রেসের প্রদর্শনী কোন আইনে বন্ধ, আইনটা দেখান…

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। এখানেই জন্ম নিয়েছেন সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। এই মাটির সংগীতচর্চা, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা একসময় দেশের অন্যতম গর্বের বিষয় ছিল।
কিন্তু গত এক দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম জাতীয় সংবাদে যতবার এসেছে, তার বেশিরভাগই এসেছে সহিংসতার কারণে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ধর্মীয় উস্কানি, মবের তাণ্ডব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা এবং প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অভিযোগ নিয়ে।
সম্প্রতি বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ হওয়ার ঘটনা তাই বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। বরং এটি এমন ধারাবাহিকতার সর্বশেষ অধ্যায়, যার শুরু আরও অনেক আগে।
প্রায় দশ বছর আগে, ২০১৬ সালে নাসিরনগরে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা হয়, শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একাধিক মন্দির ভাঙচুর করা হয়। পরে তদন্তে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। কে উস্কানি দিল, কারা হামলার পরিকল্পনা করল, প্রশাসন আগে থেকে উত্তেজনার খবর পেয়েও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিল না! তবে এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি।
পাঁচ বছর পর ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে। হেফাজতে ইসলামের ডাকা বিক্ষোভ দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটে। এরপর শহরের বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বাড়ি ও কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি হামলাটি হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর। হামলার শিকার হয়েছিল সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ স্মৃতি জাদুঘর ও সংগীতাঙ্গন। যে মানুষটির নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বিশ্বসংগীতের মানচিত্রে স্থান দিয়েছে, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানও রক্ষা পায়নি। সেদিন শুধু একটি ভবন ভাঙচুর হয়নি; আঘাত করা হয়েছিল একটি জেলার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ওপর।
এই ঘটনার পর বহু মামলা হয়েছে, শত শত মানুষকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু সেসব ঘটনার শেষ পরিণতি কী? কয়টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে? কতজন অপরাধী আইন ও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে?
আর এখানেই ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বিতর্কের সঙ্গে অতীতের ঘটনাগুলোর একটা নিবিড় যোগসূত্র তৈরি হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি গত ঈদের সবচেয়ে বেশি ব্যবসাসফল সিনেমা বনলতা এক্সপ্রেস প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিল। জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি সংগঠন নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অংশ হিসেবেই এ আয়োজন করেছিল।
কিন্তু ঘোষণা দেওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়। বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামার শহর, এখানে সিনেমা প্রদর্শন হতে দেওয়া যাবে না। এরপর বিষয়টি সাংগঠনিক রূপ নেয়। একটি বৈঠক থেকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হয় যে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে দেওয়া হবে না।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। বাংলাদেশের আইন বনলতা এক্সপ্রেস প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেনি, সিনেমাটি সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমোদন প্রাপ্ত। তাহলে ঠিক কোন আইনি ভিত্তিতে একটি গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত নেয় যে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন করা যাবে না? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এমন ঘোষণার পর প্রশাসন কী করেছে?
আয়োজকরা সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় ভেন্যু হারালেন, হাজার চেষ্টা করেও নতুন ভেন্যু পেলেন না। প্রশাসনের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলেন না। ফলে বৈধ একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন বাতিল হয়ে গেল।
কিন্তু এতোকিছুর পরেও এতেও বিতর্ক থামেনি, বরং আরেকটু বেড়ে গিয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এক কনটেন্ট নির্মাতা রঙ্গন, নিজ উদ্যোগে উন্মুক্ত স্থানে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। তার সাথে স্থানীয় মানুষের সমর্থনও ছিল। কিন্তু প্রদর্শনী শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন।
এটি শুধু একটি সিনেমার গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার গল্প।
যখন কোনো গোষ্ঠী ঘোষণা দেয় যে একটি বৈধ অনুষ্ঠান হতে দেওয়া হবে না, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত অনুষ্ঠানটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্রের কাজ হলো আইন মান্যকারী নাগরিককে সুরক্ষা দেওয়া, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া পক্ষকে পুরস্কৃত করা নয়।
কিন্তু বাংলাদেশে বহু ক্ষেত্রেই উল্টো চিত্র দেখা যায়। সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সভা বাতিল করা হয়। সাংস্কৃতিক আয়োজন স্থগিত করা হয়। ফলে যারা চাপ সৃষ্টি করে, তারা কার্যত তাদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলে।
এভাবেই ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়। যেখানে আইন নয়, চাপ কাজ করে। যেখানে মবের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে।
এটি কোনো চলচ্চিত্রকে ঘিরে মতভেদের প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন। রাষ্ট্র কি সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করবে, নাকি সম্ভাব্য চাপের মুখে বারবার পিছু হটবে?
কারণ একটি সমাজে সিনেমা বন্ধ হওয়ার ঘটনা কখনোই শুধু সিনেমা বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়। এটা হয় মূলত আইনের শাসন শক্তিশালী হবে, নাকি ভয় ও চাপের রাজনীতি আরও শক্তিশালী হবে এই প্রশ্নোত্তরের মুহূর্ত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আজ সেই প্রশ্নের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।





