ভারত থেকে ফিরে আসা শিশু কেউ পাচারের শিকার, কারও জন্মই ভারতে

ভারতে কারাভোগ শেষে দেশে ফেরা ২০ শিশুর মধ্যে কেউ কেউ পাচারের শিকার হয়েছিল। অন্যান্যরা বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়ে ধরা পড়ে। তাদের অভিভাবকরা এখনও ভারতের বিভিন্ন জেলে আটক আছেন।
গত ১৩ মে সন্ধ্যায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারের কাছে ১৩ টি মেয়ে শিশু ও সাতটি ছেলে শিশুকে হস্তান্তর করে। এই শিশুরা বাগেরহাট, খুলনা, নড়াইল ও যশোর জেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
এদের প্রত্যেকেই কারাভোগ করেছে। পরে ভারতীয় মানবাধিকার সংস্থার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়।
বাংলাদেশ প্রান্তে রাইটস যশোর, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি ও জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়।
ফিরে আসা এক কিশোরীর (অপ্রাপ্তবয়স্ক ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ায় নাম প্রকাশ করা হলো না) বাবা রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, তাঁর মেয়েকে ভালো কাজের আশায় একটি যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। মেয়ে দেশে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করত।
"আব্বা, আমি মনে হয় আর দেশে ফিরতে পারব না। আমারে বিক্রি করে দিছে "তুমি আমারে বাঁচাও" - এই ছিল পাচারের সময় মেয়ের সঙ্গে বাবার শেষ কথোপকথন।
ঢাকার তুরাগ থানা এলাকার ওই কিশোরীর বয়স তখন ছিল ১৪-১৫। পরিবারের সঙ্গে অভিমান, অল্প বয়সে ভেঙে যাওয়া বিয়ে আর ভালো জীবনের প্রতিশ্রুতিতে সে ঘর ছেড়েছিল বলে জানায় তার পরিবার।
সেখান থেকে প্রথমে কলকাতার হাওড়া, পরে মহারাষ্ট্রের পুনের কুখ্যাত যৌনপল্লী 'বুধবার পেথ'-এ বিক্রি করে দেওয়া হয় তাকে।
প্রায় তিন বছর পর দিন কয়েক আগে সে দেশে ফিরেছে।
ওই কিশোরীকে পুনেতে মাদক, ওষুধ ও ইনজেকশন দেওয়া হয়েছেও বলেও জানায় পরিবার। দিন পনেরো পরে সে পালিয়ে একটি পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নেয়।
এরপর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাকে একটি সেফ হোমে পাঠায়। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় আরেক দীর্ঘ অপেক্ষা। পরিচয় যাচাই, আইনি জটিলতা, কাগজপত্র, দুই দেশের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সব মিলিয়ে দেশে ফিরতে সময় লেগে যায় প্রায় তিন বছর।
ওই একই সেফ হোমে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি নারী ও শিশু রয়েছে। যাদের কেউ পাচারের শিকার, কেউ আবার বছরের পর বছর অবৈধভাবে ভারতে আটকে ছিল।
ফিরে আসা শিশুদের একজন ১৪ বছর বয়সী সুমি খাতুন। রোকেয়া কালেকটিভকে সে জানায়, তার জন্মই ভারতে। বাংলাদেশী মা এবং বোনের সঙ্গে সে এত বছর দিল্লিতেই ছিল। ওখানে অভিযান শুরু হওয়ায় তারা সপরিবারে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে।
গত এক বছর তার মা ভারতীয় কারাগারে। সুমি, রুমি দু বোন সেই পুরো সময়টা কাটিয়েছে ভারতীয় সেফ হোমে। সম্প্রতি তাদের দেশে পাঠানো হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে রাইটস যশোরের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কর্মকর্তা তৌফিকুজ্জামান রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন, "ভারতীয় বিভিন্ন সরকারি শেল্টার হোমে বাংলাদেশি শিশু ও নারীরা থাকে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কলকাতার বাংলাদেশ উপ-হাই কমিশনের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।"
তিনি আরো বলেন, ফিরে আসা শিশুরা বিভিন্ন সময় মা-বাবার সঙ্গে কাজের সন্ধানে বা পাচার হয়ে ভারতে গেছে। কেউ এক-দুই বছরও কাজ করেছে। পরে অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে ধরা পড়েছে। তখন শিশুদের সরকারি শেল্টার হোমে পাঠানো হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ উপ-হাই কমিশন এবং দুই দেশের প্রশাসনিক যাচাই শেষে ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে তাদের দেশে পাঠানো হয়।
ভারতের ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন সূত্রে জানা যায়, ভারতের কলকাতা উপহাইকমিশন থেকে ইস্যুকৃত বিশেষ ট্রাভেল পারমিট এবং ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) এক্সিট পারমিটের মাধ্যমে তাদের ফেরত পাঠানো হয়। উভয় দেশের বিজিবি, বিএসএফ, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।





