শিল্পখাতে ইউএসটিআর তদন্ত: বিধিনিষেধ এলেই ভুগবে শ্রমিকরা

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিনিধি
শিল্পখাতে ইউএসটিআর তদন্ত: বিধিনিষেধ এলেই ভুগবে শ্রমিকরা
1

ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ (ইউএসটিআর) বাংলাদেশসহ ১৬ টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তারা দেখতে চায় শ্রমে বাধ্য করার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশগুলোর কোনো ব্যর্থতা আছে কি না।

ইউএসটিআর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতি বাণিজ্য, পণ্য ও প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ নীতির বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্বপ্রাপ্ত।

"শ্রমে বাধ্য না করার ব্যাপার আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থাকার পরও সরকারগুলো এসব বিধিবিধান মানায় ব্যর্থ হয়েছে এমন দেশগুলোর পণ্য বাজারে ঢোকাচ্ছে। তারা এ ধরনের পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে কোনো কার্যকর ব্যবস্থার প্রয়োগ ঘটাতে পারেনি," গত ১২ মার্চ ইউএসটিআর দূত জেমিসন গ্রিয়ার এই মন্তব্য করেন।

তাঁরা বলতে চাইছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীরা বিদেশি পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। কারণ যে দেশগুলো তাদের শ্রমিকদের কম পয়সায় অতিরিক্ত খাটাচ্ছে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিনিদের চেয়ে কম দামে পণ্য দিতে পারছে।

ইউএসটিআর এর এই তদন্ত নিয়ে কি বাংলাদেশের ভয় পাওয়ার কিছু আছে? রোকেয়া কালেকটিভ জানতে চেয়েছিল বাংলাদেশের সুপরিচিত শ্রমিক নেত্রী ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির প্রতিষ্ঠাতা কল্পনা আক্তারের কাছে।

কল্পনা আক্তার বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন কিছু নয়। সাধারণত এ ধরনের তদন্তের প্রস্তাব কোনো দেশের সরকার বা শ্রমিক সংগঠনগুলো করে থাকে। এর আগেও, অর্থাৎ শেখ হাসিনার শাসনামলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও এবং ইউএসটিআরের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে এ ধরনের অভিযোগ ছিল বলে শোনা যায়।

"অভিযােগগুলে মূলত ফোর্সড লেবার (জোরপূর্বক শ্রম) কিংবা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার না দেওয়া এমন," আক্তার রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।

"তবে এবারকার প্রেক্ষাপট আমার জানা নেই," তিনি বলেন।

আক্তার বলেন, এ ধরনের তদন্ত সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়; একে বলা যায় "ম্যারাথন ইনভেস্টিগেশন"। কোনো সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে হয়ে যায়—ব্যাপারটা তেমন নয়। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়, তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সময়ও চাইতে পারে—যেমন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো ঠিক করে ফেলবে বলে প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

কল্পনা আক্তার বলেন, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক প্রমাণ তাদের হাতে আগেই আছে। যেমন—নানা ছলছুতোয় শ্রমিক ইউনিয়ন তৈরিতে বাধা দেওয়া, কম মজুরি, জোরপূর্বক শ্রম ইত্যাদি। তবে গত বছরের শেষে, বিশেষ করে নভেম্বরে যখন শ্রম আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হয় এবং আইএলও-র কয়েকটি কনভেনশন অনুমোদন করা হয়, তখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়।

তবু মনে রাখতে হবে—আইনটি এখনো সংসদে পাস হয়নি। এটি এখন অধ্যাদেশ হিসেবে জারি আছে। সংসদে গেলে যদি এতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়, বিশেষ করে শ্রমিকের অধিকারের জায়গায়, তাহলে ইউএসটিআর আবার বিষয়টি নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

শ্রম আইন (অধ্যাদেশ) পরিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়ায় আইএলও যুক্ত ছিল। তাদের সঙ্গে আরও কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করেছে, যার মধ্যে মার্কিন দূতাবাসও ছিল। তাই তারা দেখবে—অধ্যাদেশে কোনো ধরনের পরিবর্তন আসে কিনা।

"সরকার পরিবর্তনের আগে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমরা দেখেছি—মালিকপক্ষ বেশ জোরালোভাবে কথা বলছে। তারা ইউনিয়ন গঠনের থ্রেশহোল্ডসহ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন চাচ্ছে। কিন্তু সরকারের স্তরে এ নিয়ে আসলে কী কাজ হচ্ছে, বা আদৌ কোনো কাজ হচ্ছে কিনা—সেটা নিয়ে আমাদের কাছে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই," কল্পনা আক্তার বলেন।

তাঁর মতে শ্রমে বাধ্য করার যে বিষয়টি সামনে এসেছে, সে ক্ষেত্রে যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে পারে, তাহলে বড় ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব। কিন্তু যদি তা না পারি, তাহলে কিছু বিধিনিষেধ সেগুলো কী ধরনের হবে—তা পুরোপুরি তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। কারণ বিধিনিষেধেরও বিভিন্ন স্তর আছে।

কল্পনা বলেন, যদি বড় ধরনের 'রেস্ট্রিকশন আসে'—ধরা যাক বর্ডার রেস্ট্রিকশন—তাহলে বাংলাদেশের জন্য জন্য তা বড় সমস্যা হবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা আগে থেকেই স্থগিত আছে। এর সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও প্রবেশে সমস্যা হয়, তাহলে বড় চাপ তৈরি হবে।

আর যদি তুলনামূলক কম মাত্রার বিধিনিষেধ আসে—যেমন কমপ্লায়েন্স-ধরনের—তাহলে ক্রেতারা নতুন করে দরকষাকষি শুরু করবে। তারা মূল্য পরিশোধে দেরি করবে, নতুন নতুন শর্ত চাপিয়ে দেবে।

কোন স্তরের রেস্ট্রিকশন আসবে—তা এখনো অনেক দূরের বিষয়। সরকার যদি বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারে, তাহলে সমস্যা এড়ানো সম্ভব।

কিন্তু যদি বিধিনিষধ আরোপ হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের ওপর। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য ছোট কোনো বাজার নয়; এটি একটি বড় বাজার। গার্মেন্টস, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্পে আমাদের রপ্তানি অনেকাংশে এ বাজারের ওপর নির্ভর করে।

বিশেষ করে গার্মেন্টস খাতে এর প্রভাব বেশি পড়বে। এই শিল্পে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বেশি, তাই তাদের ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে। অর্ডার কমে গেলে বা দাম কমানোর চাপ এলে মালিকরা সাধারণত শ্রম ব্যয় কমানোর চেষ্টা করে। তখন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

একজন শ্রমিক যে বেতন পায়, যে খাবার খায় এবং যে পরিমাণ কাজ করতে পারে—এই তিনটির মধ্যে যদি ভারসাম্য না থাকে, তাহলে তার জীবন ও অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সিদ্ধান্ত যাই হোক, যে পক্ষই নিক না কেন, শেষ পর্যন্ত ভোগান্তির শিকার হয় শ্রমিকরাই, কল্পনা আক্তার রােকেয়া কালেকটিভকে বলেন।