যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ভেস্তে গেল, এখন কী?

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ভেস্তে গেল, এখন কী?
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। ছবি: সংগৃহিত

পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে এখনো খুব পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। দুই পক্ষের কাছ থেকে পাল্টাপাল্টি হুমকি ছাড়া আর কিছু শোনা যায়নি। অন্যান্য দেশও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে।

এ নিয়ে রোকেয়া কালেকটিভ কথা বলেছে সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামসের সঙ্গে। তিনি মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর কী ঘটতে যাচ্ছে, তা বুঝতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।

“২৪ ঘণ্টা পর হয়তো কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে। এই মুহূর্তে কিছু বলা কঠিন,” বিনতে শামস রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।

সাবেক এই কূটনীতিকের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই ইরানের মেহের নিউজ এজেন্সি জানায়, ইরান ও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ হয়েছে।

আর তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সে দেশের সংবাদমাধ্যম আনাদোলুকে বলেছেন, সংলাপ ভেস্তে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশই আসলে যুদ্ধবিরতির ব্যাপারে আন্তরিক।

অথচ রোববার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে বলেছেন, “এখন থেকেই কার্যকর! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বসেরা নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ বা প্রস্থান করার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজকে বাধা দেবে। এক সময় আমরা দেখব, সব জাহাজই স্বাভাবিকভাবে প্রণালীতে প্রবেশ ও প্রস্থান করছে, ইরান যার অনুমতি দিচ্ছে না।”

এরপর ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, “আন্তর্জাতিক জলসীমায় জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ অবৈধ কাজ এবং দস্যুতার সমান।”

এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেছেন, এ যুদ্ধে তাদের টেনে নেওয়া যাবে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শেহবাজ শরিফের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বিবিসির প্রধান আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা লিজ ডুসেট “সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পর বড় প্রশ্ন, এরপর কী হবে?” শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন বিবিসির জন্য।

অনেকে এই বৈঠককে ম্যারাথন বলে আখ্যা দিলেও লিজ ডুসেট বলছেন, ৪৭ বছরের শত্রু সম্পর্কের অবসানের জন্য ২১ ঘণ্টা যথেষ্ট সময় নয়।

তিনি এই বৈঠককে ব্যর্থ বলেও উড়িয়ে দিতে নারাজ। কারণ, এই বৈঠকে খুব জটিল কিছু বিষয়ে—যেমন ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ নিয়ে মতানৈক্য কমিয়ে আনা, পাশাপাশি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব—এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

“কিন্তু চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে দুই পক্ষের মধ্যে যে গভীর অনাস্থা, তা থেকে আগে বেরিয়ে আসতে হবে,” মন্তব্য করেন ডুসেট।

ডুসেট আরও বেশ কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি তার দলকে সমঝোতায় ফেরাবেন? যদিও তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সেরা প্রস্তাবই দিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি যুক্তরাষ্ট্র আবারও যুদ্ধের মাত্রা বাড়াবে, না কি সমঝোতায় যাবে?

ডুসেটের ভাষায়, সারা বিশ্ব এখন একটি রায়ের অপেক্ষায় আছে।

এদিকে মাশফি বিনতে শামস বলেন, এই যুদ্ধ যেদিকেই যাক, তা পুরো বিশ্বের জন্যই একটি বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করছে। কোনো দেশই এর প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারবে না।

“বিশেষ করে যেসব দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি। তাই আমাদের আরও সতর্কভাবে এগোতে হবে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশকে এই মুহূর্তে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদ দিয়েছেন এই কূটনীতিক। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার নীতিগত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছে বলেই তিনি মনে করেন।

“এই পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার সুযোগ ছিল কি না, সেটাও ভাবার বিষয়। কারণ আমাদের জন্য একেবারে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া অনেক সময় কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।”

“তবে আমরা আমাদের নীতিগত অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছি,” বলেন মাশফি বিনতে শামস।

সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের অনুমতি পায়নি ইরানের কাছ থেকে। যদিও ঢাকায় ইরানি রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি এর আগে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

এটি কি কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা? এ বিষয়ে মাশফি বিনতে শামস বলেন, “ইরান বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে, তাই তাদের সিদ্ধান্তও অনিশ্চিত হতে পারে।”

“তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও হয়তো অবস্থান যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি, এটাও সত্য।”

গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানকে আহ্বান জানিয়েছেন। ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এ আহ্বান জানান।

এখন প্রশ্ন হলো, দুটি যুদ্ধ কি দীর্ঘ হবে? এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে কী ঘটতে পারে?