জাহাঙ্গীরনগরে গোপনে ছাত্রীদের ভিডিও ধারণ, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ভবনের নারী শিক্ষার্থীদের ওয়াশরুমে গোপনে ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে এক বহিরাগত যুবক আটক হওয়ার ঘটনায় আবারও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযুক্তের মোবাইল ফোনে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ক্যাম্পাসের ছাত্রীদের গোপনে ধারণ করা প্রায় ১৪০টি ভিডিও পাওয়া গেছে। এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
গত সোমবার (২৯ জুন) দিবাগত রাত ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে বড় পর্দায় ব্রাজিল-জাপানের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার পর কয়েকজন ছাত্রী টিএসসির ওয়াশরুমে যান। এ সময় এক যুবককে ছাত্রীদের ওয়াশরুম থেকে তড়িঘড়ি বের হতে দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়। পরে তাঁকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তাঁর মোবাইল ফোনে তল্লাশি চালিয়ে ওয়াশরুমের দরজার ছোট ছিদ্র দিয়ে ধারণ করা ভিডিও পাওয়ার দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।
এটি সাম্প্রতিক সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরির একমাত্র ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ এবং বহিরাগতদের অবাধ চলাচলের একাধিক ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের সবচেয়ে প্রাণবন্ত আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গভীর রাত পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আড্ডা, সাংস্কৃতিক আয়োজন, মুক্ত পরিবেশ ও বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাস এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের রাতেও ক্যাম্পাসে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরার সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিবাচক পরিচয়ের অংশ হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
চলতি বছরের ১২ মে রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ফজিলাতুন্নেছা হল-সংলগ্ন সড়ক থেকে এক ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে অন্ধকারে নিয়ে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। পরে সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন একজনের চেহারা শনাক্ত করা গেলেও এখনো তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় হত্যাচেষ্টা ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা করে।
এরপর থেকেই আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
এই আন্দোলন চলাকালেই গত ১৭ মে ক্যাম্পাসের তিনটি ভিন্ন স্থানে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণের অভিযোগে তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
এরও আগে পয়লা বৈশাখে এক নির্মাণশ্রমিক নারী শিক্ষার্থীদের আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে আটক হন। পরে তাঁর মোবাইল ফোনে তল্লাশি চালিয়ে দেখা যায়, তিনি কয়েক মাস ধরে এ ধরনের ভিডিও ধারণ করে আসছিলেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রভাবশালী অংশের আশ্রয়ে বহিরাগতরা নিয়মিত হলে অবস্থান করেন, মোটরসাইকেল মহড়া দেন এবং নির্জন এলাকায় আড্ডা জমান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, “রাজনৈতিক কর্মসূচি বা শক্তি প্রদর্শনের সময় বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে আনা হয়। পরে তারা ক্যাম্পাসেই অবাধে চলাফেরা করে। প্রশাসন সব জেনেও নীরব থাকে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ৫১ ব্যাচের শিক্ষার্থী তাজনীন নাহার তাম্মি বলেন, “গত ১২ মে এক বহিরাগত কর্তৃক সংঘটিত ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার এত দিন পার হয়ে গেছে, কিন্তু অপরাধী এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এরই মধ্যে আন্দোলন চলমান অবস্থায় আমাদের নারী শিক্ষার্থীরা আবারও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আমরা দেখছি, শুধু ক্যাম্পাস নয়, ক্যাম্পাসের বাস, এমনকি ওয়াশরুমও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ নয়। এতগুলো ঘটনার পরও দুঃখজনকভাবে আমরা কোনো কার্যকর বিচার দেখতে পাইনি। বরং অপরাধীরা কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে অপরাধপ্রবণতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বহিরাগত নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কোনো কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ছে না। বর্তমান প্রক্টরের আমলে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও তার কোনো জবাবদিহি আমরা দেখছি না।”
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান বলেন, “নিরাপত্তা জোরদার করতে আমাদের আরও জনবল প্রয়োজন। ইতিমধ্যে কিছু নিয়োগপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করছি, যাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা যায়।”
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পাশে মহাসড়ক, অন্য তিন পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসতি। পশ্চিম দিকের বাসিন্দারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়েই চলাচল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীজনের সহযোগিতা ছাড়া বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।”





