বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রি: সুতোয় বোনা ইতিহাস আর মুছে যাওয়া নারী

একাদশ শতাব্দীর একটি লম্বা কাপড়ের ফালি। প্রায় সত্তর মিটার দীর্ঘ, লিনেনের ওপর উলের সুতোয় সূচিকর্মে গাঁথা। নাম তার বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রি। ১০৬৬ সালের হেস্টিংসের যুদ্ধ, ইংল্যান্ডে নরম্যান বিজয়, রাজা হ্যারল্ডের মৃত্যু—ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র যে সংঘর্ষে নতুন করে আঁকা হয়েছিল, তারই দৃশ্যমান দলিল এটি। আটান্নটি দৃশ্য, মোট ৬২৬টি মানবচরিত্র, ২০২টি ঘোড়া, ৩৭টি জাহাজ, আর মাত্র ছয়জন নারী।
প্রায় এক হাজার বছর পর ট্যাপেস্ট্রিটি ফ্রান্স থেকে ফিরেছে ইংল্যান্ডে। এতদিন এটি ছিল ফ্রান্সের নরম্যান্ডির ঐতিহাসিক শহর বাইয়ুর জাদুঘরে। এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এটি প্রদর্শিত হবে দ্য ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। ইতিহাসের শিক্ষার্থী তো বটেই, নৃতত্ত্ববিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সামরিক ইতিহাসের গবেষক কিংবা জেন্ডার বিশেষজ্ঞ—সবাই মুখিয়ে আছেন এই অনন্য নিদর্শনটি নতুন করে দেখার জন্য।

কিন্তু এক হাজার বছর আগের একটি সূচিশিল্প নিয়ে এত আগ্রহ কেন?
সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে ফিরে যেতে হবে একাদশ শতকে।
নিঃসন্তান অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর সদ্য মারা গেছেন। প্রচলিত ধারণা ছিল, জীবদ্দশায় তিনি নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়ামকে ইংল্যান্ডের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর স্ত্রীর আত্মীয় হ্যারল্ড গডউইনসন।

এদিকে সিংহাসনের আরেক দাবিদার ছিলেন নরওয়ের রাজা হ্যারল্ড হারডারা। ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চল দখলের পর তাঁর লক্ষ্য ছিল সিংহাসন দখল। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ১০৬৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের যুদ্ধে হ্যারল্ড গডউইনসনের বাহিনীর কাছে পরাজিত হন তিনি। তবে সেই বিজয়ের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র তিন দিন।
২৮ সেপ্টেম্বর নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম ইংল্যান্ডে অবতরণ করেন। ১৪ অক্টোবর হেস্টিংসের যুদ্ধে তিনি হ্যারল্ড গডউইনসনকে পরাজিত করেন। ইতিহাস তাঁকে চেনে উইলিয়াম দ্য কনকারার নামে।

বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে শুধু এই যুদ্ধের ইতিহাসই নয়, ধরা পড়েছে একাদশ শতকের সমাজজীবনেরও বিস্তৃত ছবি। এতে রয়েছে এডওয়ার্ড দ্য কনফেসর থেকে শুরু করে সিংহাসনের তিন দাবিদার, তাঁদের যুদ্ধকৌশল, জাহাজ, অস্ত্রশস্ত্র, সৈন্যসমাবেশ, শিকার, ভোজ, ধর্মীয় আচার এবং যুদ্ধের আগে-পরে মানুষের জীবনযাত্রার নানা দৃশ্য। ব্রিটিশ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের ধারণা, নরম্যানদের নির্দেশনায় এই ট্যাপেস্ট্রিটি বুনেছিলেন ইংল্যান্ডের একদল দক্ষ নারী বুননশিল্পী।
ছয়শো ছাব্বিশ মানবচরিত্র, নারী মাত্র ছয়
আগেই বলেছি, এই ট্যাপেস্ট্রিতে মোট মানবচরিত্র ৬২৬টি। এর মধ্যে মাত্র ছয়জন নারী। খেয়াল করলে দেখা যায়, এই ছয়জনের মধ্যেও রয়েছে এক ধরনের স্তরবিন্যাস। মূল আখ্যানে, রাজদরবারের দৃশ্যে নাম-পরিচয়সহ উপস্থিত মাত্র তিনজন নারী। বাকি তিনজন রয়েছেন প্রান্তরেখায়। একজন সম্ভবত যৌন নিপীড়নের শিকার, একজন শোকে কাতর, আরেকজন জ্বলন্ত ঘর থেকে শিশুকে নিয়ে পালাচ্ছেন। তাঁদের কারও নাম নেই, পরিচয় নেই। তাঁরা মূল বয়ানের অংশ নন, কেবল সহিংসতার মুহূর্তে দৃশ্যমান হয়ে ওঠা কিছু অবয়ব।
যে তিনজনের নাম আমরা জানি, তাঁরাও এক অর্থে অনুপস্থিত। একজন রানি এডিথ, এডওয়ার্ড দ্য কনফেসরের স্ত্রী। স্বামীর মৃত্যুশয্যার পাশে তাঁর নীরব উপস্থিতিই তাঁর একমাত্র ভূমিকা।
অপরজন এডিথ সোয়াননেক, যাঁকে অনেক ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড গডউইনসনের সঙ্গিনী বা প্রথম স্ত্রী বলে মনে করেন।
আর সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র অ্যালফগিভা। একটি দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, তাঁর গালের দিকে হাত বাড়িয়েছেন এক যাজক। দৃশ্যটির ওপরে লেখা একটি লাতিন বাক্য আজও গবেষকদের কাছে ধাঁধা হয়ে আছে।
এই তিনজনের একজনও আখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন। তাঁরা উপস্থিত, কারণ কোনো না কোনো পুরুষের গল্পে তাঁদের প্রয়োজন হয়েছে।

এখানেই ট্যাপেস্ট্রিটির সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ। অধিকাংশ ইতিহাসবিদের ধারণা, এই অসাধারণ শিল্পকর্মটি বুনেছিলেন নারীরাই। ইংল্যান্ডের সূচিশিল্প ও বুননশৈলী সে সময় ইউরোপজুড়ে খ্যাতি অর্জন করছিল। অনেক গবেষকের মতে, কেন্টের কোনো মঠের সন্ন্যাসিনী কিংবা পেশাদার নারী বুননশিল্পীদের একটি দল, সম্ভবত বিশপ ওদোর তত্ত্বাবধানে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন। কিন্তু যারা ইতিহাস বুনলেন, ইতিহাসের ভেতরে তাঁদের জায়গা হলো না।
কেন্দ্রে থাকতে হলে নারীকে হতে হয়েছে কারও স্ত্রী, কারও মা কিংবা কোনো ক্ষমতাবান পুরুষের আত্মীয়। আর যে নারী নিছক সহিংসতার শিকার, তাঁর স্থান কেবল প্রান্তে, নামহীনতায়। ক্ষমতা তাঁকে ঠিক ততটুকুই দৃশ্যমানতা দেয়, যতটুকু আখ্যানের প্রয়োজনে দরকার। এর বেশি নয়।
ট্যাপেস্ট্রিতে প্রাণীর সংখ্যা ৭৩৭। রয়েছে নানা জাতের পশু-পাখি, এমনকি পৌরাণিক প্রাণীও। আছে ২০২টি ঘোড়া ও খচ্চর, ৪১টি জাহাজ ও নৌকা, ৩৭টি ভবন। তবু এই বিপুল আখ্যানের ভেতরে নারীর উপস্থিতি প্রায় অদৃশ্য।
ট্যাপেস্ট্রির পঞ্চান্নতম দৃশ্যে হ্যারল্ডের মৃত্যু ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত চিত্র। চোখে বিদ্ধ একটি তীর যেন তাঁর পরাজয়ের প্রতীক। কিন্তু পরবর্তী গবেষণা বলছে, সেই তীরটি হয়তো মূল নকশার অংশই ছিল না; পরবর্তী শতকের কোনো সংস্কারের সময় তা যুক্ত করা হয়েছে।
এমনকি কে আসলে হ্যারল্ড, তীরবিদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা যোদ্ধা, নাকি পাশে তরবারির আঘাতে নিহত সৈনিক, তা নিয়েও ইতিহাসবিদদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। অর্থাৎ, যাকে আমরা ইতিহাস বলে জানি, সেটিও অপরিবর্তনীয় নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষমতা, স্মৃতি ও ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তা পুনর্লিখিত হয়েছে। ইতিহাস কোনো স্থির টেক্সট নয়; এটি এক চলমান আলোচনা, যার নিয়ন্ত্রণ প্রায়শই ক্ষমতাবানদের হাতেই থাকে।

এই কাঠামো আমাদের নিজস্ব ইতিহাসেও অচেনা নয়। বাংলাদেশের তাঁতশিল্প, নকশিকাঁথা কিংবা মসলিনের ইতিহাসে বারবার দেখা যায় একই বিস্মৃতি। যে নারীর হাতে সুতো ঘোরে, ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম প্রায়ই অনুপস্থিত। অথচ বাণিজ্য, পৃষ্ঠপোষকতা বা মালিকানার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই ইতিহাসে বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।
শ্রম আর কর্তৃত্বের এই বিভাজন, যেখানে হাতের কাজ নারীর, আর নামের মালিকানা অন্যের, সময় ও ভূগোল পেরিয়ে এক পুনরাবৃত্ত কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই নীরবতার ভেতরেও কিছু ফাটল থেকে যায়। ট্যাপেস্ট্রির প্রান্তরেখা বা বর্ডারের নকশায় জায়গা করে নেয় ঈশপের গল্প, কৃষিকাজ, জেলে আর শিকারিদের জীবন। বুননশিল্পীরা কৌশলে তুলে ধরেছেন সে সময়কার দৈনন্দিন জীবন, যা কখনো কখনো যুদ্ধের রক্তাক্ত আখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। শান্ত, নিরুপদ্রব জীবনের ছবিতে অতর্কিতে এসে ঢুকে পড়েছে মৃত সৈন্য কিংবা ক্ষতবিক্ষত ঘোড়ার দেহ।
হয়তো ইতিহাসের কেন্দ্রে জায়গা না পেয়েই বুননশিল্পীরা প্রান্তেই লিখে গেছেন নিজেদের টীকা, ঠিক যেমন মধ্যযুগীয় সন্ন্যাসীরা পাণ্ডুলিপির প্রান্ত-অলংকরণে রেখে যেতেন মূল আখ্যানের বাইরের কথা। কেন্দ্র যাঁদের প্রত্যাখ্যান করে, তাঁরা প্রান্তকেই নিজের ভাষা বানিয়ে নেন।
বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রি কেবল ১০৬৬ সালের যুদ্ধের দলিল নয়। এটি ইতিহাস-রচনার রাজনীতিরও এক আয়না, যেখানে যে বোনে আর যাকে নিয়ে বোনা হয়, তাদের মধ্যকার দূরত্বই আসল গল্প। নারীর অনুপস্থিতি এখানে নিছক ফাঁক নয়, বরং কাঠামোগত সহিংসতার এক নীরব স্বাক্ষর। এটি মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনো নিরপেক্ষ নথি নয়; বরং কার কণ্ঠ শোনা হবে, কার শ্রম মুছে যাবে, সেই চিরন্তন দ্বন্দ্বেরই দলিল, যা হাজার বছর পরও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছে এই ট্যাপেস্ট্রি। নরম্যান বিজয়ের পর এই প্রথম এটি ফ্রান্স ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফিরেছে। বিনিময়ে ব্রিটিশ মিউজিয়াম ফ্রান্সকে ধার দিচ্ছে সাটন হু-র অ্যাংলো-স্যাক্সন সংগ্রহ, ইংল্যান্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। ফরাসি-ব্রিটিশ কূটনীতির এই বিরল মুহূর্তে দুই দেশ কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে একে অপরের হাতে তুলে দিচ্ছে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান সাক্ষ্য।





