“বিশ্বের বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পারিবারিক আইন সংস্কার করেছে” — ফাওজিয়া করিম ফিরোজ

রোকেয়া কালেকটিভ প্রতিবেদক
“বিশ্বের বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পারিবারিক আইন সংস্কার করেছে” — ফাওজিয়া করিম ফিরোজ
ফাওজিয়া করিম ফিরোজ | ইউএস এম্ব্যাসি ঢাকা

নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, বাংলাদেশে পারিবারিক আইন সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেই অনেকেই এটিকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে উপস্থাপন করেন। অথচ বিশ্বের বহু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ গত কয়েক দশকে নিজেদের পারিবারিক আইন সংস্কার করেছে।

রোকেয়া কালেকটিভকে সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, অভিন্ন পারিবারিক আইন, বৈবাহিক ধর্ষণ, যৌনকর্মীদের সুরক্ষা এবং সন্তানের হেফাজত নিয়ে একটি পক্ষ যা প্রচার করেছে, তার অনেকগুলোই আসলে কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে মেলে না।

ফাওজিয়া বলেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অনেক দেশে বহুবিবাহ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোথাও ধর্মীয় আদালতের পাশাপাশি সিভিল আইনের ব্যবস্থাও রয়েছে। আবার কোথাও তালাকের পর নারীর আর্থিক সুরক্ষাকে আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।

“যেমন সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় মুসলিম নারীরা বিবাহবিচ্ছেদের পর স্বামীর সম্পত্তিতে অংশ বা ক্ষতিপূরণ পান। মালয়েশিয়ার শরিয়া আদালতই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করে। তিউনিশিয়া ও মিশরের পারিবারিক আইনও অনেক বেশি প্রগতিশীল,” ফাওজিয়া করিম ফিরোজ রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে এসব দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়।

কমিশনের অন্যতম আলোচিত প্রস্তাব ছিল দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনের পর বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ফাওজিয়া করিমের ভাষ্য, বর্তমানে অনেক নারী ১৫, ২০ কিংবা ৪০ বছর সংসার করার পরও বিবাহবিচ্ছেদের সময় কার্যত কোনো সুরক্ষা পান না। অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরের পরিমাণ এতটাই কম যে তা নারীর জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি বলেন, কমিশন যে ঐচ্ছিক অভিন্ন পারিবারিক আইনের কথা বলেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল সব ধর্মের নারীর জন্য সমান আইনি সুরক্ষার একটি বিকল্প তৈরি করা। এটি বাধ্যতামূলক করার কোনো প্রস্তাব ছিল না।

তাঁর মতে, দীর্ঘ দাম্পত্যের পর বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর ক্ষতিপূরণ বা আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ধারণা ইসলামী আইনেও রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই বিষয়টি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না।

সন্তানের হেফাজত নিয়ে কমিশনের সুপারিশও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

আইনজীবী ফাওজিয়া বলেন, বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সন্তানের বয়স নয়, বরং ‘বেস্ট ইন্টারেস্ট অব দ্য চাইল্ড’ বা শিশুর সর্বোত্তম কল্যাণকে প্রধান বিবেচ্য হিসেবে দেখা হয়।

তিনি বলেন, আদালত এখন ক্রমেই এ নীতির দিকে এগোচ্ছে। ধর্মীয় বিধানের নির্দিষ্ট বয়সসীমার পরিবর্তে বিচারকেরা দেখেন, কোন অভিভাবকের কাছে থাকলে শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণ সবচেয়ে বেশি নিশ্চিত হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি সাবেক বিচারপতি ইমান আলীর একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ওই রায়ে বিচারপতি অত্যন্ত সতর্কভাবে ধর্মীয় বিতর্ক এড়িয়ে শিশুর কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

দত্তক গ্রহণ নিয়েও ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছে বলে মনে করেন কমিশনের এ সদস্য।

ফাওজিয়া বলেন, ইসলামী আইনে উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত কারণে প্রচলিত অর্থে দত্তক গ্রহণের সীমাবদ্ধতা থাকলেও কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব গ্রহণে বাধা নেই।

তাঁর মতে, যারা কোনো শিশুকে লালন-পালন করেন, তাঁরা চাইলে জীবিত অবস্থায় ‘হিবা’ বা উপহার হিসেবে সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারেন। এতে উত্তরাধিকার নিয়ে পরবর্তী পারিবারিক বিরোধও কমে।

একইভাবে যেসব পরিবারের শুধু কন্যাসন্তান রয়েছে, তারাও জীবদ্দশায় সম্পত্তি হিবা করে দিলে ভবিষ্যতে পারিবারিক বিরোধ অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

ফাওজিয়া করিম ফিরোজের মতে, কেবল আইন পরিবর্তন করলেই বিচার নিশ্চিত হবে না। বিচারব্যবস্থার অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার নেই। হাতে গোনা কয়েকটি ল্যাবরেটরি দিয়ে সারা দেশের মামলা পরিচালনা করতে হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানও নেই।

ফলে অনেক মামলায় ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে।

তিনি আরও বলেন, দুর্গম এলাকা বা চরাঞ্চলে ধর্ষণের শিকার কোনো নারী দ্রুত চিকিৎসা বা ফরেনসিক পরীক্ষার সুযোগই পান না। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাতেও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সবসময় পাওয়া যায় না।

বিচারব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতা হিসেবে তিনি আদালতের পরিবেশের কথা উল্লেখ করেন।

তাঁর ভাষ্য, অনেক জেলা আদালতে ভুক্তভোগী বা সাক্ষীদের জন্য বসার জায়গা, বিশুদ্ধ পানি কিংবা শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুবিধাও নেই। ফলে একটি মামলার শুনানির জন্য মানুষকে দিনের পর দিন চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

তিনি বলেন, এসব মৌলিক সেবা নিশ্চিত না করে শুধু নতুন আইন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, নিম্ন আদালতে অনেক সময় উভয় পক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি না শুনেই আদেশ দেওয়া হয়। আবার পারিবারিক মামলার নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়।

ফাওজিয়া করিম ফিরোজ পুলিশের তদন্ত-সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা না বাড়ালে শুধু আইন পরিবর্তন করে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

“কিছু বিচারকের আচরণও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিশু-সংক্রান্ত মামলায় আদালতের সংবেদনশীলতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন,” ফাওজিয়া রোকেয়া কালেকটিভকে বলেন।

ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, কমিশনের অনেক সুপারিশ নিয়ে যে প্রচার হয়েছে, তার সঙ্গে প্রতিবেদনের প্রকৃত বক্তব্যের মিল ছিল না। ফলে মূল সুপারিশের পরিবর্তে ভুল ব্যাখ্যাই বেশি আলোচনায় এসেছে।

তাঁর মতে, নারী, শিশু এবং পরিবারের অধিকার নিয়ে যেকোনো সংস্কারের আলোচনায় মতপার্থক্য থাকবে। তবে সেই আলোচনা যেন তথ্যভিত্তিক ও বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে হয়, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।