পশ্চিমা 'ট্র্যাডওয়াইফ' বা 'আদর্শ গৃহবধু' ধারণার পেছনের রাজনীতিটা আসলে কি?

চিত্রনায়িকা শাবানার প্রসঙ্গ টেনে আনার আগেই ক্ষমা চেয়ে নিই। তাঁকে গেল কয়েক দশক ধরে ট্রল করা হয় সেলাই মেশিন ঘুরিয়ে চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ বা এমন কিছু গড়ে তোলা নিয়ে। তিনি সিনেমায় সেই আদর্শ সর্বংসহা গৃহবধু, ভাবি, মা বা বোন। এর বাইরেও তিনি বহু চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কিন্তু মানুষের মনে গেঁথে আছেন আবহমান' কাল ধরে নারীকে এ দেশের সমাজ যেভাবে দেখতে চায় সেই চরিত্রের কারণে।
অনেকেই হয়তো জানেন পশ্চিমা বিশ্বেও আবার কদর বেড়েছে এমন তথাকথিত আদর্শ গৃহবধু ধারণার। সমাজমাধ্যমের বদৌলতে এই নারীদের গৃহস্থালিকেন্দ্রিক কাজকর্ম, স্বামীসেবা, সন্তান লালনপালনের গৌরবময় উপস্থাপন আপনাদের মনেও হা-হুতাশ তৈরি করতে পারে। মনে হবে, আহা এই নারীদের চেয়ে পরিপূর্ণ, সুখের জীবন আর কী-ই বা হতে পারে! এদের একটা নামও আছে 'ট্র্যাড ওয়াইফ'। কথা না বাড়িয়ে চলুন ট্র্যাড ওয়াইফ নিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করা যাক।
মূল গল্পে যাওয়ার আগে একটা বিষয় পরিষ্কার করে নিই। যে নারীরা গৃহস্থালির কাজে যুক্ত আছেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তান লালনপালন করছেন তাঁদেরকে ছোট করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং ট্র্যাডওয়াইফের জীবনকে যাঁরা আদর্শ জীবন বলে প্রচার করছেন তার পেছনের রাজনীতিটা জানানো। মজার ব্যাপার হলো যারা এই ক্যাম্পেইনের সঙ্গে যুক্ত তারা সবাই প্রচুর টাকার মালিক। শাবানার মতো সেলাই মেশিন চালিয়ে তাঁদের আমার ঘর আমার বেহেশত' বানাতে হয়নি।
হান্নাহ নিলম্যান এই ঘরানার সেলিব্রিটিদের এজন। এই মুহূর্তে ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারী ১ কোটি ৪ লাখ ছাড়িয়েছে।
হান্নাহ কীভাবে মাঠ থেকে গম নিয়ে এসে, ভাঙিয়ে, গাছ থেকে স্ট্রবেরি তুলে, মুরগীর ঘর থেকে ডিম সংগ্রহ করে প্যানকেক বানিয়ে তার ওপর একটু মধু ঢেলে সন্তানদের খাওয়ান, অনলাইনে বসে বসে এসব দেখা নরনারীর সংখ্যা প্রচুর।
কয়েক বছরের ভেতর ‘ব্যালেরিনা ফার্ম’-খ্যাত ইনফ্লুয়েন্সার হান্নাহ নিলম্যান ৮ সন্তানের জননী হন। আর তাঁর জনপ্রিয়তাও বাড়ে হু হু করে। আস্তে আস্তে হান্নাহ নিলম্যানের ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট হতে থাকে। যিনি ‘ব্যালে’ ছেড়ে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সন্তানদের নিয়ে মাঠে আর খামারে কাজ করেন, রান্না করেন। সন্তান পালন করেন আর প্রাকৃতিক ও ধীরগতির জীবনযাপনের নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেন ইনস্টাগ্রামে।
একদিকে বিপুল জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে বিতর্ক
অনেকে মনে করেন, হান্নাহ তাঁর কনটেন্টে নারীদের জন্য এমন একটি জীবনধারা আদর্শ হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে নারীর প্রধান পরিচয় গৃহিণী ও মা। তবে হান্নাহ বলেছেন, তিনি নিজেকে ট্র্যাডওয়াইফ হিসেবে পরিচিত করতে চান না। তিনি কাউকে তাঁর জীবন অনুসরণ করতেও বলেননি। তিনি যেভাবে বাঁচতে চান, সেভাবেই বাঁচেন। আর সেই জীবন ভাগ করে নেন অনলাইনের অনুসারীদের সঙ্গে!
ট্র্যাড ওয়াইফ কী?
ট্র্যাড ওয়াইফ বলতে কি বোঝায় তার একটা উদাহরণ হতে পারে বারবারা বিলিংসলে অভিনীত ১৯৫০-এর দশকের জনপ্রিয় টেলিভিশন চরিত্র জুন ক্লিভার। জুন সবসময় দামি পোশাক পরে ঘরের কাজ করতেন, পরিবার ও সন্তানদের খুব যত্ন নিতেন। সন্তানদের ছোট ছোট ভুলের সুন্দর সমাধান দিতেন। আজ পর্যন্ত তাকে আদর্শ মায়ের প্রতীক হিসেবে তুলনা করা হয়। কিন্তু ট্র্যাডওয়াইফের ধারণা জুন ক্লিভারের কাল্পনিক চরিত্রের চেয়েও বেশি কিছু। কারণ ট্র্যাডওয়াইফ ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে স্বামীর প্রতি অনুগত থাকার শর্ত, স্বামী ও পরিবারের সেবায় নিজেকে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রাখার মতো বিষয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্র্যাডওয়াইফদের জনপ্রিয়তা সাংবাদিক ও সামাজিক বিশ্লেষকদেরও নজর কেড়েছে। এই যেমন সাবেক মিস কানাডা সিনথিয়া লোয়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর কেনো পেশাজীবনের চেয়ে পারিবারিক জীবনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ, সেই বিষয়ে একাডেমিক আলোচনা করেন।
আর হালে সব মনোযোগের কেন্দ্রে আছেন দক্ষিণপন্থী নেতা চার্লি কার্কের স্ত্রী এরিকা ক্লার্ক।
ইতিহাসে ট্র্যাডওয়াইফ ধারণার কালো অধ্যায়…
কেউ এই প্রবণতার শিকড় খুঁজে পান ১৯৫০-এর দশকে, আবার কেউ আলোচনায় আনেন হান্নাহ নিলম্যানকে। তবে মার্কিন ইতিহাসে এসব প্রবণতার পেছনের আদর্শিকভিত্তি অনেক বেশি উদ্বেগজনক।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্র্যাডওয়াইফ ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাব নতুন। তবে রক্ষণশীল সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যম ব্যবহারের ইতিহাস মোটেই নতুন নয়। আঠারো শতকের অ্যাংলো-আমেরিকায় নারীরা ‘কনডাক্ট লিটারেচার’ নামে পরিচিত বিপুল পরিমাণ লেখার মুখোমুখি হতেন। পত্রিকা, সংবাদপত্র ও উপন্যাসে প্রকাশিত এসব লেখায় নারীদের কীভাবে আচরণ করা উচিত, বিশেষ করে বিবাহিত জীবনে তাঁদের ভূমিকা কী হবে—তা নির্ধারণ করে দেওয়া হতো।
‘কনডাক্ট লিটারেচার’ এর প্রভাবে নারীদের স্বাধীনতার পরিসর ছিল খুবই সীমিত। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরে তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকত না বললেই চলে। একজন ‘ভালো স্ত্রী’র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হতো, ‘কঠোরভাবে নীতিবান, বিনয়ী ও নম্র। চিন্তা, কথা ও কাজে নির্মল ও পবিত্র। তাঁকে স্বামীর সহচর হিসেবে সবসময় স্বামীর সেবা ও সন্তুষ্টিকেই নিজের প্রধান দায়িত্ব মনে করতে হবে। তাঁর সুখও নির্ভর করবে স্বামীর সুখের ওপর।’
স্ত্রীদের প্রতি এই সামাজিক প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছে দ্য ককেট (১৭৯৭) ও পামেলা (১৭৪০)-এর মতো জনপ্রিয় উপন্যাসেও।
আঠারো ও উনিশ শতকের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের স্বামীর প্রতি আনুগত্য কেবল নৈতিক নির্দেশনা ছিল না; এটি ছিল আইনেরও অংশ। সে সময় ‘কোভারচার’ নামে একটি আইনি নীতির অধীনে বিবাহিত নারীর স্বতন্ত্র আইনি পরিচয় কার্যত স্বামীর পরিচয়ের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেত। বাস্তবে কোভারচার আইন স্ত্রীর স্বাধীন আইনি অস্তিত্বই মুছে দিয়েছিল। বিবাহিত নারীর নিজের নামে কোনো সম্পত্তির মালিক হওয়ার অধিকার ছিল না। তিনি যা আয় করতেন, তা আইনত স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হতো। এমনকি নিজের শরীরের ওপরও পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল না। আঠারো শতকে বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। একইভাবে গৃহস্থালি সহিংসতাকেও ‘অবাধ্য’ স্ত্রীকে শাসনের বৈধ উপায় হিসেবে মেনে নেওয়া হতো। তাই ট্র্যাড ওয়াইফ ধারণা যেভাবেই ফিরে আসুক না কেনো, তা যদি নারী স্বেচ্ছায় গ্রহণ না করেন, সেটিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
‘ট্র্যাডওয়াইফ’ ধারণার পক্ষের কথা
এই ধারণার সমর্থকদের মতে, আধুনিক কর্পোরেট জীবনের মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে নারীরা পরিবারকে সময় দিয়ে বেশি খুশি থাকেন। ট্র্যাডওয়াইফদের মতে, কোনো জোরজবরদস্তি ছাড়া নিজের ইচ্ছায় গৃহিণী হওয়াও নারীর স্বাধীনতারই অংশ। কর্পোরেট জীবনের তুমুল প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপ এড়িয়ে তারা শান্ত এবং ধীরগতির জীবনধারা বেছে নেন।
হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক দক্ষতা যেমন—স্ক্র্যাচ থেকে বেকিং, সেলাই এবং বাগান করার মতো কাজগুলোকে এই আন্দোলন আবার জনপ্রিয় করে তুলছে। ট্র্যাডওয়াইফের পক্ষের লোকেরা এ-ও বলেন যে নারী-পুরুষ কাউকে কারও চেয়ে ছোট করার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিবার ও সমাজে তাঁদের ভূমিকা ভিন্ন।
ট্র্যাডওয়াইফের ধারণা কি আদৌ কোনো সমাধান আনে?
সমালোচকেরা বলেন, এটি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কমিয়ে দেয়। আর পুরোনো পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনে, যেখানে নারীরা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েন। আবার কোনো কারণে বিবাহবিচ্ছেদ হলে বা স্বামীর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, নারীদের নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস বা সঞ্চয় থাকে না। ফলে তারা চরম আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন। তাই ট্র্যাডওয়াইফ হওয়া কোনোকালেই বিচ্ছিন্নভাবে দু’একটি ক্ষেত্র ছাড়া সামগ্রিকভাবে কোনো নারীগোষ্ঠীকে মুক্তি দেয়নি, আধুনিক কালেও সেই সম্ভাবনা নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাস্তব নান্দনিকতা
সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখানো নিখুঁত, পরিপাটি এবং দাগহীন জীবনধারা আসলেই কি বাস্তবসম্মত? হান্নাহ নীলম্যান নিজের খুশিতে ট্র্যাডওয়াইফ হতে পেরেছেন, কেননা, তাঁর শ্বশুর বিমান উদ্যোক্তা ডেভিড নীলম্যান বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন। তাই তিনি অনলাইনের দুনিয়ায় সেই সম্পদ ব্যবহার করে ‘ফ্লেক্স’ করতে পারেন। এটি কি সাধারণ কর্মজীবী বা সাধারণ গৃহিণীদের মনে হীনম্মন্যতা ও মানসিক চাপ তৈরি করে না? ঘরকন্নার কাজকে একটি রোমান্টিক রূপ দেওয়া হলেও, বাস্তবে ঘরের সব কাজ একা হাতে সামলানো অত্যন্ত ক্লান্তিকর। যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পারিশ্রমিক নেই।
তো আপনাদের কি মনে হয়? আদতেই কি তথাকথিত ট্র্যাড ওয়াইফের জীবনই নারীদের কাম্য হওয়া উচিত? না এই আন্দোলন আড়াল থেকে নারীদের সমঅধিকারের লড়াইকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে পুরুষতান্ত্রিকতাকে জিইয়ে রাখতে?







