সরকারি শিশু পরিবার ও প্রবীণদের প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি কি শুধু কথার কথা?

সরকারি শিশু পরিবার নাকি এতিম অর্থাৎ "পিতৃহীন বা পিতৃমাতৃহীন দরিদ্র শিশু" দের পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ-ভালবাসা ও আদর-যত্নের সাথে লালন পালন করে। এখানেই শেষ নয়, আরও নানা কিছু করে। যেমন, শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান, নিবাসীদের শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবিক উৎকর্ষতা সাধন ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশের ৮৫ শিশুকেন্দ্রে ১০ হাজারের ওপর শিশু সরকারি তথ্য মতে এসব সুযোগ পায়।
দেশে ছিন্নমূল শিশুর তুলনায় এই সুযোগ যে একেবারেই অপ্রতুল তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ফরিদপুরের শিশু পরিবারের শিশু ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আসলে শিশুরা সেখানে পারিবারিক পরিবেশে স্নেহ-ভালবাসা-আদর-যত্নে বড় হচ্ছে না। যদি তা-ই হতো তাহলে ১৪ বছরের কিশোরী ধারাবাহিক ধর্ষণের শিকার হতো না, আর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ছয় মাস পর কর্তৃপক্ষ হঠাৎ নড়েচড়ে উঠত না।
গেল সপ্তাহে আরও যে ঘটনা কারও কারও বিবেককে নাড়া দিয়েছে সেটি হলো, নির্যাতনের পর নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনে ববি বেগমের (৭০) মৃত্যু। বাকপ্রতিবন্ধী এই নারী অস্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন। তিনকূলে কেউ নেই। রেলস্টেশনই তাঁর আবাস। তিল তিল করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেই টাকায় চোখ পড়েছিল দুর্বৃত্তরা। যেহেতু টাকা তাদের চাই-ই তাই এর মালিকের বয়স, শারীরিক অবস্থা কোনো কিছুই বিচার করেনি তারা। মারধোরের পর সমাজমাধ্যমে আমরা চােখে মুখে কালশিটে পড়া ববি বেগমের কথা জানলাম। কিছুদিন পর তিনি চলেও গেলেন।
আসলে ববি বগমের এই কোঁচকানো কালশিটে পড়া মুখটাই আজকের বাংলাদেশ। এই মানচিত্র আঘাতে আঘাতে ক্লিষ্ট। তার চোখের দুই পাশে, গালে, ঠোঁটে জখম। যন্ত্রণায় সে কাতর, উদভ্রান্ত। ববি বেগমের মতোই বাকশক্তি রহিত হয়েছে তার।
যুদ্ধ পরিস্থিতির বাইরে এমন দেশ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে ফুল দেওয়ার কথা বলে, চকলেটের প্রতিশ্রুতি, মুঠোফোনে কার্টুন দেখানোর লোভ দেখিয়ে প্রতিদিন প্রাপ্তবয়স্ক এমনকি মধ্যবয়সী, প্রৌঢ় ও প্রবীণ লোকেরা শিশুদের ধর্ষণ করে (ফরিদপুরে র ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির বয়স ৫৪)।
আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা ধরুন। জিম্মাদারদের হাতে শিশুরা ধর্ষণ বলাৎকারের শিকার হয়। তাদের রক্ষকরা চুপ করে থাকে। আরেক পক্ষ গলা ফাটায় ধর্ম গেল গেল বলে। অথচ যেখানে এতিম শিশুরা লেখাপড়া করে, মানুষের দানে ভিক্ষায় যাদের কোনো রকম বেঁচে থাকা তাদের ওপর জুলুম অমার্জনীয় পাপ, ধর্মই বলে।
তো এখন দেখা গেল শুধু বেসরকারি মালিকানাধীন এতিমখানা নয়, সরকারি শিশু পরিবারেও শিশুদের সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থ। এ যে কত বড় লজ্জা! দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা চোখ মেললে দেখতে পেতেন, মানচিত্রটা লজ্জায়, ঘৃণায় কেমন কুঁচকে আছে।
খুব বেশি দিনের কথা নয়। গত বছরই ইউনিসেফ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ দেখেছে বাংলাদেশের প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে প্রায় তিনজন (২৮ দশমিক ৯ শতাংশ) বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। এই হার দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্কদের হারের (২১ দশমিক ৪৪ শতাংশ) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এ দেশে ৩৪ লাখের বেশি (সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের জরিপ) মাত্র ১০ হাজারের জন্য রাষ্ট্র শিশু পরিবারের ব্যবস্থা করেছে। যেন এই ১০ হাজারের বাইরে শিশুরা ভিনগ্রহী। এই ১০ হাজার শিশুই বা কেমন আছে, আদতে সরকারি শিশু পরিবার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নিজেদের কাছে রেখেছে তার কতটা পূর্ণ হচ্ছে সে কথা সরকার কি আসলেই জানে?
শিশুদের মতো ববি বেগমের মতো অসহায় বৃদ্ধদের দেখাশোনা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকার তা ভুলে বসে আছে। অবশ্য এ কথা বললেই একটা পক্ষের তৎপরতা দেখা যাবে। সমালোচনা হলেই রাশি রাশি ভারা ভারা ফাইলের চিপা থেকে সম্পর্কিত নথি বের করতে তাদের একমিনিটও সময় লাগে না। তারা নিজেদের সমর্থনে কি বলতে পারে, তাও বলে রাখি। সরকার পিতা-মাতার ভরনপোষণ আইন করেছে, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা আছে, আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা আছে, স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ায় অগ্রাধিকার আছে । আহা মধু মধু!
তাহলে কেন ববি বেগমদের রেলস্টেশনে দুর্বৃত্তদের হামলায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়? এ প্রশ্নের জবাব কি সরকার দেবে?
একেক সময় মনে হয়, শুধু আইন দিয়েও সব হয় না। শুভ বুদ্ধির - বিবেকের উদ্বোধন লাগে। নইলে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, প্রবীণদের জন্য কিতাবে এত এত ভালো ভালো কথা লেখা থাকার পরও কেন তাদের এই হাল? এ দেশের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কবি ও কেরানী কী নিদারুণ নৈর্ব্যক্তিক! সবার বিবেক ঘুমিয়ে আছে। সেই সুযোগে মানচিত্রকে মনের আনন্দে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে একদল লোক।








