বাংলাদেশ: মাতৃত্বের সুখ ও শঙ্কা যেখানে হাত ধরাধরি করে চলে

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
বাংলাদেশ: মাতৃত্বের সুখ ও শঙ্কা যেখানে হাত ধরাধরি করে চলে
ছবি: সংগৃহিত

দ্রীয় চরিত্রে আছে বিধবা মা মোক্ষদা আর তার দস্যি ছেলে রাখাল। আছেন মৈত্র মশাই, ব্রাহ্মণ, মাঝি আর নাম না-জানা তীর্থযাত্রীরা।

মৈত্র মশাই সাগরসঙ্গমে যাবেন তীর্থ করতে। গোছগাছ চলছে। এর মধ্যে মোক্ষদা পায়ে এসে পড়ল। তারও কিছু পুণ্য প্রয়োজন। মোক্ষদা নেহাত অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছেন। মন গলে গেল মৈত্র মশাইয়ের। মোক্ষদাকে সঙ্গে নিতে নির্দেশ দিলেন ব্রাহ্মণকে। কিন্তু তার একরত্তি ছেলেটির কী হবে? জবাব তৈরিই ছিল মোক্ষদার। ও থাকবে মাসির কাছে। ছেলে জন্মের পর মরতে বসেছিলেন মোক্ষদা। বোনই আগলে রেখেছিল ছেলেকে।

যাওয়ার দিন দেখা গেল, রাখালই নৌকায় উঠে বসে আছে সবার আগে। কিছুতেই সে নামবে না। মোক্ষদা খেপে গিয়ে বললেন, ‘চল তোরে দিয়ে আসি সাগরের জলে!’ কেন যেন সঙ্গে সঙ্গেই বুক কেঁপে উঠল মোক্ষদার। মৈত্র মশাইও ধমকে দিলেন, অমন কথা বলতে আছে? ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলেন মোক্ষদা, বারবারে হাত বুলালেন ছেলের গায়ে। নৌকা চলতে শুরু করল।

হঠাৎ নদীতে প্রবল ঢেউ। সঙ্গে যার যা ছিল, দেবতার উদ্দেশে তার সবই ছুড়ে ফেলতে লাগলেন যাত্রীরা। তখনই ব্রাহ্মণ মনে করালেন, মোক্ষদা তার ছেলেটিকে সাগরে দিতে চেয়েছিল। নৌকাভর্তি এত মানুষের প্রাণ বাঁচাতে হলে ফেলতে হবে শিশুটিকেই। বুকের মধ্যে শক্ত করে মোক্ষদা ছেলেকে চেপে ধরলেন। বললেন, ‘শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা? শোননি কি জননীর অন্তরের কথা?’ কে কার কথা শোনে। কোল থেকে রাখালকে কেড়ে নিলেন ব্রাহ্মণ। মোক্ষদা মূর্ছা গেলেন।

শিশুটিকে ফেলে দেওয়া হলো ‘দেবতার গ্রাস’ হিসেবে, নৌকাভরা যাত্রীর প্রাণের বিনিময়ে। শিশুটিকে বাঁচাতে পরমুহূর্তেই ব্রাহ্মণও ঝাঁপ দিলেন। মায়ের কান্নায় আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ হয়ে গেল, তবু স্রষ্টার কাছ থেকে উপুর্যপরি প্রশ্নের কোনো জবাব পেল না মোক্ষদা। বিশাল জলরাশিতে মিলিয়ে গেল বিধবার বুকের মানিক।

আজ এই মা দিবসে আমাদের এই বাংলাদেশে মোক্ষদার মতো সন্তানশোকে হাহাকার করছেন কত শত মা! তাঁরাও কোনো প্রশ্নের উত্তর পান না, চোখের সামনে রোগে ভুগে সন্তান চলে যাচ্ছে একের পর এক।

এই এক হামের ধাক্কায় দুই মাসেরও কম সময়ে তিন শর বেশি মায়ের ভরা কোল শূন্য হলো। খবরের কাগজ খুলুন, টিভি বা মুঠোফোন স্ক্রল করুন, দেখবেন শুধু সন্তানহারা মায়ের কান্না।

তাঁদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা গল্প আছে। কেউ বহু সাধনার পর সন্তানের মুখ দেখেছিলেন। কারও বা একসঙ্গেই স্বাস্থ্যবান যমজ শিশুর জন্ম হয়েছিল। একটি গেছে, অন্যটির জীবনপ্রদীপও নিভু নিভু। এক সন্তানের দাফন শেষে অন্যটিকে বুকে চেপে ধরেছেন। কেউ এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছেন, কেউ পাননি একটা আইসিইউ। কেন, তার কোনো জবাব নেই।

এই মা দিবসে যারা সন্তান কোলে হাসপাতালে এসে শূন্য হাতে ফিরে গেলেন, তাঁদের জন্য প্রার্থনা করি। সন্তান হারানোর শোক মায়ের বুকে চিতার মতো জ্বলে, তবু তাঁরা যেন একটু হলেও স্বস্তি খুঁজে পান।

এই মুহূর্তে স্বস্তির প্রার্থনা আরও দুজন হবু মায়ের জন্য। সন্তান ধারণ বা জন্মদান যাঁদের জন্য আনন্দের কোনো বার্তা বয়ে আনে না, সমাজের কাছে গ্লানিকর। নেত্রকোনার সাড়ে ১১ বছরের আর দিনাজপুরের ১২ বছরের হবু মায়েদের কথা যেন অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনার চাপে আমরা ভুলে না যাই। তাঁদের সুরক্ষা যেন অগ্রাধিকার পায়।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, এ দেশে মা হওয়ার আনন্দ কেন চিরস্থায়ী হয় না অনেকের বেলায়? কেন সেই আনন্দের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে শঙ্কা? কেন মনে হয়, সন্তান এ দেশে বেঁচেবর্তে থাকবে তো!

কারণ একটাই। এখানে মায়েদের হাহাকারের নিত্যনতুন আয়োজন চলে।

এ রাষ্ট্রে সন্তানদের একটা স্বাভাবিক জীবন যাঁদের দেওয়ার কথা, তাঁদের অনেকেরই সমানুভূতি দূরে থাক, ভাববার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই নেই। তাই হামে-ডেঙ্গুতে-গুলিতে প্রাণ হারায়। কেউ কোনো জবাব দেয় না। মায়ের কান্না চলে ‘যাবৎ জীবন’।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘এত রক্তের দামে, এত কষ্টের, এত মৃত্যুর দামে’ আমরা কি আসলে এই চেয়েছিলাম? আমরা তো অপেক্ষায় ছিলাম মমতার দিনের, আমরা চেয়েছিলাম সমতা। সেই দিন কেন অধরাই থেকে গেল?

মা দিবসে সব মায়ের জন্য শুভকামনা। সবার সন্তান দুধে-ভাতে থাকুক। মায়ের কোলজুড়ে বুকের মানিক হয়ে থাকুক।