নেকাব-হিজাবে হাঁ, নেকাব -হিজাবে না

শুভ্রা মারিয়াম
নেকাব-হিজাবে হাঁ, নেকাব -হিজাবে না
ছবি: এআই/ রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

দুইটা বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়ারই সৌভাগ্য(!) হয়েছে আমার।

প্রথমে বলি ধার্মিক ও কঠোর রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠায় অনেকটা অদৃশ্য থাকা ও অস্তিত্ব সংকটে ভোগার বিষয়টা।

স্বস্তি পাইনা বলে হাত ও মুখাবয়ব খোলা রাখি। এ বিষয়টি নিজের পরিবারকে মানাতেই আমার লেগেছে লম্বা সময়। তারপরও পুরোপুরি হলো কিনা সেটা নিশ্চিত নই।

ধর্মের সঙ্গে হাত ও মুখাবয়ব দেখানোর কোনো বিরোধ নেই, কিন্তু তাঁদের গোঁড়ামি দেখে অভ্যস্ত চোখ এটা মানতে পারছিল না।

এ পর্যায়ে ইসলামে পর্দার বিধান সম্পর্কে কিছু কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।

পবিত্র কুরআনের সূরা আন নূরের আয়াত ৩০–৩১ এ বলা আছে

"মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত।"

আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য বা অলংকার প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশিত থাকে তা ব্যতীত। তারা যেন তাদের ওড়না (খিমার) বক্ষদেশের ওপর টেনে দেয়..."

আবার সূরা আল-আহযাবের ৫৯ নম্বরআয়াতে বলা হয়েছে ,

"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, আপনার কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন বাইরে বের হওয়ার সময় তাদের চাদর (জিলবাব) নিজেদের গায়ের ওপর ভালোভাবে টেনে নেয়। এতে তাদের সহজে চেনা যাবে (যে তারা সম্মানিত ও সচ্চরিত্র নারী) এবং তারা হয়রানির শিকার হবে না। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।"

গুরুত্বপূর্ণ হলো যে হিজাব নিয়ে এত আলোচনা, সে শব্দটি কোরআনে মোট সাতবার এসেছে। কিন্তু কখনই নারীর মাথার ওড়না বা আবরণ বোঝানো হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি এমন কিছু বোঝায় যা আড়াল, দেয়াল, পর্দা বা সুরক্ষামূলক বিভাজক হিসেবে কাজ করে।

এর একটি উদাহরণ হলো সূরা আল-আহযাবের ৫৩ নম্বর আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে:

"আর যখন তোমরা (নবীর স্ত্রীদের) কাছে কোনো কিছু চাইবে, তখন পর্দার (হিজাবের) আড়াল থেকে চাইবে।"

পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর নয়।

আমার শিক্ষকতা পেশায় আসা ইসলামিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার পর্ব শেষে চূড়ান্ত বাছাইয়ের আগে নানাভাবে জানানো হয়েছে নারী শিক্ষক মুখাবয়ব দেখাতে পারবেন না। মুখ না ঢাকলে পর্দা হচ্ছে না, এই তাদের যুক্তি। প্রয়োজনে মাস্ক পরার উপদেশ দেওয়া হয়েছে কোথাও কোথাও।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্য ইস্যুতে মাস্কের কথা আসছে না। শুধুমাত্র নারীকর্মীদের মুখ যেন দেখা না যায় সেজন্য এত আয়োজন। নারীদের মুখ দেখা গেলে পুরুষের আধিক্য আছে এমন প্রতিষ্ঠানে স্কুল কর্তৃপক্ষের নাকি অসুবিধা হয়।

নারীদের অদৃশ্য করে রাখবার এর চাইতে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আর কোথায় পাবেন?

মুদ্রার অপর পিঠের দিকটা খুব ভালো মনে হচ্ছে কী?

তাহলে শুনুন, কয়েক বছর আগে আমি দ্বিতীয় একটি পেশা হিসেবে সংবাদ উপস্থাপনের কাজ খুঁজেছিলাম। শিক্ষকতার পাশাপাশি খন্ডকালীন একটা কাজ হিসেবে।

দুটো কোর্স করলাম, শিখলাম, অনুশীলন ও নানা কিছুর পর অডিশন দিতে গিয়ে হিজাবী মেয়ে দেখে চোখ কুঁচকে যেতে দেখতাম। হিজাব পরে অডিশন দেবে! তা কীভাবে সম্ভব!

শেষ যে অডিশন আমি দিই তাতে আমাকে বলাই হলো অডিশন যতই ভালো হোক হিজাব পরিহিতা কাউকে তারা নেবে না। বলে একদিক থেকে ভালই করেছে। শুধু শুধুই বেগার খাটুনি খাটতে যাচ্ছিলাম।

এখানে মেল গেজকে তুষ্ট করতে হিজাব খুলে ফেলতে হবে, মোদ্দা কথা হলো এই।

হিজাব পরে ড্রামস বাজানো নিয়েও সমাজের বিচার সভা বসাতে হবে।পুরুষ শাসিত সমাজ ঠিক করে দিতে চায় যে, হিজাব পরে নারী কী কী করবে বা করবে না। আর তাদের বেঁধে দেয়া সীমার বাইরে পা ফেললেই নারী পাপী, নষ্টা, বেয়াদব।

কোথাও পুরো মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ঢেকে অদৃশ্য হয়ে যাও, আর কোথাও হিজাব বোরকা খুলে ফেল। উদ্দেশ্য অভিন্ন। যেন নারী বিদ্বেষী পুরুষের চোখের স্বস্তি হয়।

এসব কিছুর মধ্যে মেয়েদের নিজস্বতার, ইচ্ছে-অনিচ্ছে, সুবিধে-অসুবিধের আদৌ কি কোন জায়গা আছে? নারী কি জন্ম থেকে মৃত্যু অব্দি ভারবাহী গাধার মতো পুরুষের অঙ্গুলি হেলনে নাচতে থাকবে?

কী করবে নারী?

শুভ্রা মারিয়াম: শিক্ষক ও লেখক