“দুর্বলতা আমাদের উত্তরাধিকার নয়”

নাজিয়া আফরিন
“দুর্বলতা আমাদের উত্তরাধিকার নয়”
ছবি: সংগৃহীত

কোয়েটার হুদ্দা জেলের ২০ বর্গমিটারের একটি কক্ষ। সেখানে আছে কেবল একটি ছোট খাট আর এক কোণে একটি কমোড। সেখান থেকে এক বোন ওপরের কথাটি লিখেছেন তাঁর চার ভাইবোনের উদ্দেশে। তিনি আরও লেখেন, “আমি জানি, আমি তোমাদের কতটা কষ্টের মধ্যে ফেলে দিয়েছি। আমি চেয়েছিলাম, বাবাকে হারিয়ে বড় হলেও তোমাদের জীবন শান্তিপূর্ণ হোক। চেয়েছিলাম, পুলিশের অভিযান বা কারাগার, এসব তোমাদের আর দেখতে না হোক। কিন্তু কী করব? এটাই প্রতিরোধের জীবনের কঠোর বাস্তবতা।”

কথাগুলো মাহরাঙ বালোচের। বালুচি ভাষায় ‘মাহরাঙ’ শব্দের অর্থ চাঁদের প্রভা। ২২ জুন ২০২৬, পাকিস্তান রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই প্রভাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার। কোয়েটার সন্ত্রাসদমন আদালত ৩৩ বছর বয়সী এই অধিকারকর্মীকে, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক, হত্যা ও সন্ত্রাসের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০২৪ সালে গোয়াদরে একটি বক্তৃতায় জনতাকে উসকে দিয়েছিলেন, যার ফলে মব সন্ত্রাসে একজন আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হন।

মাহরাঙের বোন ও আইনজীবী নাদিয়া বালোচ জানিয়েছেন, মামলাটি প্রথমে উন্মুক্ত আদালত থেকে কারাগারের ভেতরে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তা এক ‘চেহারাবিহীন বিচারে’ পর্যবসিত হয়, যেখানে বিচারক, কৌঁসুলি ও সাক্ষীরা কোথা থেকে যুক্ত হচ্ছেন, তা কেউ জানতেন না। অনেক অধিকারকর্মীই বলছেন, এটি বিচার নয়। এটি রাষ্ট্র পরিচালিত এক নির্ভুল অস্ত্রোপচার, যার মাধ্যমে ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধচারণকারীকে কেটে ফেলা হয়েছে।

মাহরাঙের জীবনকে বুঝতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। ২০০৯ সালে, যখন তিনি মাত্র ১৬ বছরের কিশোরী, তখন তাঁর বাবা আবদুল গাফফার লাঙ্গোভ, যিনি নিজেও একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গুম হন। প্রায় দুই বছর পর মাহরাঙের পরিবার ফোনে খবর পায়, লাসবেলা জেলায় একটি মরদেহ পাওয়া গেছে। মাহরাঙ পরে বলেছিলেন, “যখন শুনলাম বাবার লাশ পাওয়া গেছে, আমরা সেজদায় পড়ে গেলাম। প্রার্থনা করছিলাম, এটা যেন মিথ্যা হয়।”

মিথ্যা হয়নি। পরনে সেই একই পোশাক, দেহে নির্যাতনের চিহ্ন। এরপর মাহরাঙের জীবন বদলে যায়।

মাহরাঙ প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ পেয়েছেন উত্তরাধিকারসূত্রে। বাবা গুম হয়েছেন, পরে নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে ভাই নাসিরকেও নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে যায়। কোয়েটার ডেপুটি কমিশনার মাহরাঙকে বলেছিলেন, হয় ঘরে চুপ করে বসে থাকুন, নয়তো ইউরোপে চলে যান। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, “রাস্তায় থাকব, তবু পালাব না।”

এক হাতে স্টেথোস্কোপ, অন্য হাতে প্রতিরোধের পতাকা।

বালোচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ। আয়তনে দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ। সম্পদে সমৃদ্ধ, কিন্তু দারিদ্র্যে জর্জরিত এই প্রদেশে কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীয় সরকার ও সশস্ত্র স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত চলছে। এই সংঘাতের গহ্বরে হাজার হাজার মানুষ চিরতরে হারিয়ে গেছেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানে ৮ হাজার ৪৬৩টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, যারা প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছে।

মাহরাঙ এই নীরব বেদনাকে প্রকাশ্য আন্দোলনে রূপ দিয়েছেন। বালোচ ইয়াকজেহতি কমিটির (বিওয়াইসি) নেতৃত্বে তিনি দীর্ঘ পদযাত্রা, অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ সংগঠিত করেছেন, যেখানে হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনেরা, অংশ নিয়েছেন। ২০২৩ সালের বালোচ লং মার্চে তিনি তুর্বত থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন। সন্তানহারা মায়েদের আর্তিকে তিনি লাখো তরুণের তেজস্বী কণ্ঠে পরিণত করেছেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে। টাইম ম্যাগাজিনের টাইম ১০০ নেক্সট তালিকায় তাঁর নাম উঠেছে। বিবিসির ১০০ অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর তালিকায়ও তিনি স্থান পেয়েছেন। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল। আর তারপরই কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়ে। টাইম ১০০ নেক্সট তালিকায় স্থান পাওয়ার পরপরই করাচি বিমানবন্দরে তাঁর পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে নিউইয়র্কে টাইম আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি যেতে পারেননি। তাঁর আইনজীবীর ভাষায়, আন্তর্জাতিক মনোযোগ পাওয়ার পর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর বিরুদ্ধে তৎপরতা তীব্র করে।

পাকিস্তানের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী আনোয়ারুল হক কাকার এই রায়কে ‘জবাবদিহির বিজয়’ বলে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স স্পষ্ট জানিয়েছে, এই মামলা মাহরাঙ ও সিবগাতুল্লাহর শান্তিপূর্ণ মানবাধিকার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ, যেখানে ন্যায্য বিচারের মৌলিক নিশ্চয়তাগুলো পদদলিত হয়েছে।

কিন্তু এই বিচারের সবচেয়ে বড় সত্যটি আইনি নয়, রাজনৈতিক। বালোচ আন্দোলনের এই প্রজন্মের নেতৃত্ব মূলত গুম হওয়া ও নিহত ব্যক্তিদের সন্তান ও ভাইবোনদের দিয়ে গড়ে উঠেছে। বাবাদের তুলে নেওয়া হয়েছিল এক দশকে, মেয়েরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন পরের দশকে, কখনো কখনো একই ভবনে। রাষ্ট্র একটি আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে প্রতিবারই নতুন একটি প্রজন্মকে আন্দোলনের জন্য তৈরি করে।

মাহরাঙ একবার উত্তর-উপনিবেশিক তাত্ত্বিক ফ্রাঁৎস ফানোঁকে উদ্ধৃত করেছিলেন, “উপনিবেশিত মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু হলো ভূমি। যে ভূমি তাদের দেয় খাবার, আর সবার আগে দেয় মর্যাদা।”

কথাটি বালোচিস্তানের প্রেক্ষাপটে অসম্ভব রকম সত্য। যে প্রদেশের মাটির নিচে গ্যাস, তামা ও সোনা, সেই প্রদেশের মানুষ দারিদ্র্য আর অন্ধকারে দিন কাটায়। সিপিইসির নামে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সেখান দিয়ে গেছে। কিন্তু স্থানীয় মানুষ তাতে না পেয়েছেন অধিকার, না পেয়েছেন অংশীদারত্ব।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রাষ্ট্রের একটি স্বীকারোক্তি। সেই স্বীকারোক্তি হলো, মাহরাঙ বালোচকে তারা যুক্তিতে পরাজিত করতে পারেনি, তাই আইনের অস্ত্রে পরাজিত করতে চাইছে। প্রাক্তন ডন সাংবাদিক সাহার বালোচ লিখেছেন, “মাহরাঙ ও সিবগাতুল্লাহর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শুধু কঠোর নয়, এটি দুর্ভাগ্যজনক। এটি পাকিস্তানজুড়ে অন্য সব কর্মীর কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে যে শান্তিপূর্ণ তৎপরতাও এখানে সহ্য করা হবে না।”

প্রান্তিক কণ্ঠকে কেন্দ্র সবসময় ভয় পায়। কারণ প্রান্তের সত্য কেন্দ্রের মিথ্যাকে উন্মোচন করে। মাহরাঙ বালোচকে রাষ্ট্র কারাগারে পুরতে পারে, কিন্তু বালোচিস্তানের সেই অগণিত স্বজনের প্রশ্নকে কারাগারে পুরতে পারবে না, যারা এখনো রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে প্রিয়জনের ছবি আর চোখে অন্তহীন প্রতীক্ষা নিয়ে।