জার্মানির নারী উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর অন্তরালের গল্প

রোকেয়া কালেকটিভ ডেস্ক
জার্মানির নারী উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীর অন্তরালের গল্প
জার্মানির এক নারী ডানপন্থী উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিয়ে অনুসন্ধান। ছবি: স্ক্রিনশট, এআরডি, ইউটিউব

গল্প বা অনুসন্ধানের শুরুটা একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে। তরুণীরা সেখানে সাধারণত সোনালি চুল ও নীল চোখের। তারা চুল বেনি করার নিয়মাবলি, ফ্যাশনবিষয়ক অনুপ্রেরণা এবং চমৎকার সব প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি পোস্ট করে।

কিন্তু দেখতে নিরীহ এই কনটেন্টগুলোর মধ্যেই রয়েছে রাজনৈতিক বার্তা। এই তরুণীরা ‘লুক্রেটা’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া বর্ণনা অনুযায়ী, এটি একটি স্বাধীন নারী গোষ্ঠী। তারা ‘নারীর নিরাপত্তার জন্য ক্ষমতায়ন’ এবং ‘প্রচলিত লিঙ্গভূমিকা’ প্রচার করে, যেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মাতৃত্বকে।

কিন্তু #frauenfürfrauen (‘নারী থেকে নারীর জন্য’) হ্যাশট্যাগের আড়ালে তারা ‘রিমাইগ্রেশন’-এর আহ্বান জানায়। রিমাইগ্রেশন অর্থ ব্যাপক হারে সংখ্যালঘু বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বহিষ্কার। এটি উগ্র ডানপন্থীদের বহুল প্রচারিত একটি ধারণা। কিছু নেতা ও রাজনীতিবিদ এটিকে মূলধারার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আরও খুঁটিয়ে দেখলে বার্তাটি অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি ছবিতে কুয়াশাচ্ছন্ন কৃষিজমির পটভূমিতে হাতে বোনা সোয়েটার পরা এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছেন। ছবিটির ওপর বড় করে লেখা, ‘তাদের ফেরত পাঠাও’। অন্য একটি ভিডিওতে এক বক্তা বিভিন্ন অভিবাসী গোষ্ঠী সম্পর্কে কথিত অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরছেন। কিন্তু লুক্রেটা আসলে কী করে? আর সংগঠনটির প্রভাবই বা কতটা?

ইউরোপজুড়ে একদল তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী নারী ডানপন্থী কর্মীর একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক এই লুক্রেটা। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং আন্তর্জাতিক নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের পোস্ট, ভিডিও এবং ইতিবাচক উপস্থাপনাকে ব্যবহার করে অভিবাসীবিরোধী ঘৃণামূলক বক্তব্যকে স্বাভাবিক করে তোলে লুক্রেটা। সেখানে ‘রিমাইগ্রেশন’-কে নারীর অধিকারের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

লুক্রেটা নিজেদের স্বাধীন সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও এটি মূলত জার্মানির উগ্র ডানপন্থী দল ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি)-এর প্রভাববলয়ের একটি অংশ বলে মনে করেন গিসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জুলিয়ানে ল্যাং। তিনি মূলত চরমপন্থা নিয়ে গবেষণা করেন। ল্যাং এই গোষ্ঠীকে মুখোশধারী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সুপরিকল্পিত উপস্থিতি এএফডি দলের নিয়োগকৌশল হিসেবে কাজ করে। এর উদ্দেশ্য দলের এজেন্ডাকে তুলনামূলকভাবে কোমল বা গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা।

অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে চালানো অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লুক্রেটা এবং তাদের মতো অন্যান্য উগ্র ডানপন্থী নারী গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে অত্যন্ত সক্রিয়। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্য প্রচার করে এবং এএফডির মতো দলের জন্য নতুন নারী ভোটার সংগ্রহে প্রচারণা চালায়।

বর্তমানে এএফডির সদস্যদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতির হার প্রতি পাঁচজনে একজন। আমরা এএফডির অভ্যন্তরীণ যে কৌশলগত নথি দেখেছি, সেখানে ‘গৃহিণী ও মায়েদের’ সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জুনে পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেনস কংগ্রেস’-এর প্রচার চালায় লুক্রেটা তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চ্যানেলে। এটি যৌথভাবে আয়োজন করে ইউরোপীয় সার্বভৌম জাতিগোষ্ঠী (ইউরোপিয়ান সোভারেন নেশনস বা ইএসএন), যা ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জোট। সেখানে ছিলেন ইরমহিল্ড বোসডর্ফ, যিনি এএফডি দলের ইএসএন-সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধি। তাঁর মেয়ে রাইনহিল্ড বোসডর্ফ লুক্রেটার প্রতিষ্ঠাতা।

লেখাটি জিআইজেএন বাংলা থেকে নেওয়া।