সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নারীবিদ্বেষ

নাদিয়া রহমান
সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নারীবিদ্বেষ
ছবি: ইন্টারনেট

নারীরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ছবি পোস্ট করেন, মতামত দেন, ভিডিও কনটেন্ট শেয়ার করেন, তখন সবচেয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, ‘স্লাটশেমিং’-এর শিকার হন এই নারীরাই। যেন একজন নারী দৃশ্যমান হয়ে উঠলেই তাকে বিচার করা সমাজের দায়িত্ব। তার কনটেন্ট কিংবা কাজ নয়, অযৌক্তিক সমালোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে তার পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন। এখানে একজন নারীর প্রতিভা নয়, তার ‘চরিত্র’—এসব নিয়েই শুরু হয় ট্রল, কটূক্তি আর অপমান।

বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীকে ঘিরে এই ট্রল সংস্কৃতি এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে অনেকেই এটাকে ‘মজা’, ‘রোস্ট’ বা ‘ফান’ বলে পাশ কাটিয়ে যান। অথচ একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এই ট্রলগুলো নিছক হাস্যরস নয়, এগুলো মূলত নারীদের নিয়ন্ত্রণ করার সামাজিক অস্ত্র। একজন পুরুষ যদি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলেন, তাকে বলা হয় ‘স্মার্ট’। একজন নারী একইভাবে কথা বললে বলা হয় ‘অহংকারী’। একজন পুরুষ নিজের জীবন উপভোগ করলে সে ‘লাইফ এনজয়’ করছে; একজন নারী করলে সে ‘অ্যাটেনশন সিকার’। এই দ্বৈত মানসিকতাই আমাদের সমাজের গভীরে থাকা পিতৃতন্ত্রের সবচেয়ে পরিচিত রূপ।

সম্প্রতি বাংলাদেশের এক মাদ্রাসায় ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে, শিশুটি দীর্ঘদিন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল এবং পরে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশের প্রতিক্রিয়া। হয়তো একাংশ নয়, এই সংখ্যাটা ভয়ঙ্করভাবে আরও একটু বেশি। অনেকেই অপরাধীর শাস্তি চাওয়ার বদলে নির্যাতিত শিশুটির, এমনকি নারী চিকিৎসকের চরিত্রহনন করেছেন; এই সংবাদের নেপথ্যে গণমাধ্যমকে দোষারোপ করেছেন। কেউ বলেছেন, ‘মাদ্রাসার বদনাম করা হচ্ছে’, কেউ আবার সেই শিশুটির পরিবার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

এখানেই আমাদের সমাজের ভয়ঙ্কর বাস্তবতা প্রকাশ পায়। ধর্ষণের পরও আমরা ধর্ষককে নয়, নির্যাতিত নারীকেই বিচার করি। যেন একজন নারীর ওপর সহিংসতার চেয়েও বড় বিষয় হলো ‘সম্মান’ বা ‘প্রতিষ্ঠানের সম্মান’। যেন একজন নারীকে ধর্ষণ করা বা নিত্যদিন ‘শেমিং’, ‘হ্যারাস’ করা স্বাভাবিক এবং সমাজের একাংশের দায়িত্ব। নারীকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হলো—এই বোধের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নারীর পোশাক, তিনি কতক্ষণ ঘরের বাইরে থাকলেন। আরও ভয়ঙ্করভাবে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে—এই বিজ্ঞানযুগে নারী কেন ঘরের বাইরে গেলেন।

এই একই মানসিকতা আমরা দেখি নারী ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সারকে ঘিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে পরিমাণ ট্রল, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপমান হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো নারীসমাজের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে আনে। তার কনটেন্ট নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, মানুষ তার কাজের চেয়ে তার পোশাক, ব্যক্তিগত জীবন, চেহারা, সম্পর্ক—এসব নিয়েই বেশি সমালোচনা করেছে, যা একেবারেই আরোপিত।

কারণ আমাদের সমাজ এখনও নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, ‘দেখার বস্তু’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। নারীবাদী তাত্ত্বিক লরা মুলভি তার ‘মেল গেজ’ তত্ত্বে বলেছিলেন, সমাজ ও গণমাধ্যম নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তারা পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি। সামাজিক মাধ্যমে নারীদের ট্রল করার প্রবণতা অনেকাংশে সেই মেল গেজের ডিজিটাল সংস্করণ। একজন নারী দৃশ্যমান হলেই সমাজ তাকে নিজের মতো করে বিচার করার অধিকার অনুভব করে।

আরও বড় সমস্যা হলো, নারীদের বিরুদ্ধে এই অনলাইন সহিংসতাকে আমরা খুব সহজেই স্বাভাবিক করে ফেলেছি। একজন নারী সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক মতামত দিলে তাকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। একজন নারী অ্যাকটিভিস্ট কথা বললে তার ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে মিম বানানো হয়। একজন নারী ইনফ্লুয়েন্সার জনপ্রিয় হলে তাকে ‘অশ্লীল’, ‘বাড়াবাড়ি করা মেয়ে’ বলে আক্রমণ করা হয়। অদ্ভুতভাবে, একজন নারী যত বেশি সফল হন, তত বেশি তাকে অপমান করার চেষ্টা শুরু হয়। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীর সাফল্যকে সহজভাবে নিতে পারে না। তারা চায় নারী নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকুক—শান্ত, নীরব, কম দৃশ্যমান। সেই সীমা অতিক্রম করলেই শুরু হয় ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’।

সিমোন দ্য বোভোয়ার বলেছিলেন, সমাজ নারীদের ছোটবেলা থেকেই ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার শিক্ষা দেয়। ভালো মেয়ে মানে বেশি কথা বলবে না, নিজের শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হবে না, নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করবে না। তাই যখন কোনো নারী নিজের কণ্ঠে কথা বলেন, নিজের পরিচয় তৈরি করেন, তখন সমাজের একাংশ সেটিকে ‘বিদ্রোহ’ হিসেবে দেখে।

সামাজিক মাধ্যমে ট্রল সংস্কৃতি আসলে নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়ার একটি উপায়। কারণ অনলাইন অপমানের ভয় অনেক নারীকে আত্মপ্রকাশ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কেউ নিজের ছবি পোস্ট করতে ভয় পান, কেউ মতামত দিতে চান না, কেউ আবার একসময় পুরোপুরি সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে দেন। সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো, এই ট্রলিংয়ে শুধু পুরুষ নয়, অনেক নারীও অংশ নেন। কারণ পিতৃতন্ত্র শুধু পুরুষের মধ্যে নয়; এটি একটি সামাজিক মানসিকতা, যা নারী-পুরুষ সবার মধ্যেই কাজ করতে পারে। অনেক নারীও অন্য নারীর পোশাক, জীবনযাপন বা স্বাধীনতাকে বিচার করতে শেখেন এই সমাজ থেকেই।

বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যম নারীদের নতুন করে দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এখন নারীরা নিজেদের গল্প নিজেরাই বলতে পারছেন। তারা সাংবাদিকতা করছেন, ব্যবসা করছেন, কনটেন্ট বানাচ্ছেন, রাজনৈতিক মতামত দিচ্ছেন। আর ঠিক এই কারণেই ট্রলিংও বেড়েছে। কিন্তু এই বাস্তবতার মধ্যেও নারীরা থেমে নেই। প্রতিদিন হাজারো নারী অপমানের পরও লিখছেন, প্রতিবাদ করছেন, নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। কারণ তারা বুঝে গেছেন, চুপ থাকলে সমাজ কখনো জায়গা ছেড়ে দেয় না।

যদি একজন নারী সামাজিক মাধ্যমে নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিদিন অপমান, হুমকি আর ট্রলের মুখোমুখি হন, তাহলে সমস্যাটা সেই নারীর নয়। সমস্যাটা পুরো সমাজের মানসিকতায়।