শিশুটির সেলিব্রিটি বাবা কি অ্যাবসেন্ট ফাদার?

কার্ল ইয়ুং (১৮৭৫–১৯৬১)-এর নাম আপনারা অনেকেই শুনেছেন। খ্যাতনামা ও অত্যন্ত প্রভাবশালী এই মনোচিকিৎসক ও সাইকোথেরাপিস্ট কাজ শুরু করেছিলেন সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে। পরের দিকে নিজেই একটি নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। নজর দেন ব্যক্তির পূর্ণতাবোধের দিকে, যেন সে একটি পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
এই ইয়ুং মনোবিজ্ঞানে নতুন একটি পরিভাষার প্রচলন করেন, যার নাম ‘অ্যাবসেন্ট ফাদার সিনড্রোম’।
এটি কোনো চিকিৎসাগত বা মানসিক রোগনির্ণয় নয়। বরং এটি এমন এক অভিজ্ঞতা, যেখানে বাবা শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকেন বা আবেগগতভাবে দূরে থাকেন। ফলে সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
কার্ল জুং এবং পরবর্তী ইয়ুংয়ীয় বিশ্লেষকেরা এটিকে গভীর ‘ফাদার কমপ্লেক্স’ বা ‘পিতৃক্ষত’ (father wound) হিসেবে দেখেছেন। এই পিতৃক্ষতের সৃষ্টি নানাভাবে হয়—তার মৃত্যু, মাত্রাতিরিক্ত ব্যস্ততা, সন্তানকে যথেষ্ট সময় না দেওয়া, শুধু টাকা–পয়সা আর নামের শেষাংশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা ইত্যাদি।
এই অ্যাবসেন্ট ফাদার সিনড্রোমের প্রভাব ছেলে ও মেয়ে সন্তানের ওপর আবার আলাদা। সে সম্পর্কে থাকবে এ লেখার শেষের দিকে।
ভনিতার কারণ, সেলিব্রিটি এক নায়কের সম্প্রতি বাবা হওয়ার খবর। নবজাতকের প্রতি সম্মান রেখে তার নামটি এখানে লিখলাম না। তবে তার জন্মের খবর প্রকাশের পরবর্তী পাঁচ দিনে বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় দৈনিক প্রথম আলো মোট আটটি খবর প্রকাশ করেছে। অন্যান্য অনেক পত্রিকাও অনেক কিছু লিখেছে।
চলুন দেখি তাদের খবরের শিরোনামগুলো কেমন—“আবারও বাবা হলেন ডট ডট খান”, “ডট ডটের ঘরে জন্ম নিল কন্যা ডট ডট ডট”, “ডট ডট খানকে ট্যাগ করে কন্যাসন্তানের মা হওয়ার খবর দিলেন ডট ডট (নায়িকা)”, “ডট ডট এত দিন কোথায় ছিলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে কোথায়”, “বিয়ের স্মৃতি-সংসার নিয়ে যা বলেছিলেন ডট ডট”, “ডট ডটের ঘোষণার পর (আরেক স্ত্রী) ডট ডটের ফেসবুক পোস্ট, এত আলোচনা কেন? কী ছিল সেই বার্তায়”, “ডট ডটের সুখবরের পর ডট ডটের পোস্টে শুরু নতুন আলোচনা”, “রাগ ভাঙাতে ডট ডট খানই এগিয়ে আসেন, বলেছিলেন ডট ডট”, “ডট ডট খানের কাছে গুজব সামলানোর বড় শিক্ষা পেয়েছেন ডট ডট” ইত্যাদি।
পাঠক কি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন? থাক, আর সব পত্রিকার শিরোনাম যুক্ত করে আপনাদের বিরক্ত না করি।
অবশ্য কালবেলা এসবের বাইরে একটি নিউজ করেছে—“ডট ডট (প্রথম স্ত্রী) থেকে ডট ডট (দ্বিতীয় স্ত্রী): সন্তান প্রসঙ্গে কেন বারবার একই চিত্র?”
কার্ল ইয়ুংয়ের বিখ্যাত উক্তি ছিল: “একজন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” অর্থাৎ, বাবার উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি একজন মানুষের মানসিক ভিত্তিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
যখন বাবা শারীরিকভাবে পরিবার ছেড়ে চলে যান বা আবেগগতভাবে সন্তান তাঁকে কাছে পান না, তখন সন্তানের মধ্যে একটি নেতিবাচক ফাদার কমপ্লেক্স গড়ে উঠতে পারে।
শিশু এই অভাবকে নিজের ভেতরে ধারণ করে, যা পরবর্তীতে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি, অন্যদের প্রতি আস্থা রাখতে না পারা কিংবা নিজের অবস্থান বা মূল্য সম্পর্কে সন্দেহ পোষণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। পরিণত বয়সে সে নিজের সন্তানকে একটি দৃঢ় ভিত্তি বা নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারেন না।
শিশুটি যখন মেয়ে হয়, তখন অনুপস্থিত বাবা তার আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান এবং নিজের মূল্যবোধ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেন।
বাবার অনুপস্থিতিতে শিশু শূন্যতা অনুভব করে। আর থেরাপি না নিলে এই বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। আর শিশু যখন ছেলে হয়, তখন অ্যাবসেন্ট ফাদার তার ভেতরের পুরুষত্ব, পরিচয় ও কর্তৃত্ববোধ গড়ে তোলায় বাধা দেয়।
অবস্থাদৃষ্টে আমাদের ডট ডট খানকে যে কেউ অ্যাবসেন্ট ফাদার বলে ধারণা করতে পারেন। স্বীকৃতির জন্য তাঁর প্রথম স্ত্রীকে সন্তানসহ টেলিভিশনের সামনে হাজির হতে হয়েছিল। দ্বিতীয় স্ত্রীর বেলাতেও হঠাৎ জানা যায়, তিনি আবার বাবা হয়েছেন। এর কিছুদিন পর তিনি জানান, দুই স্ত্রী-ই তাঁর কাছে অতীত। এর বছর দুয়েকের মাথায় পত্রপত্রিকার খবরে জানা যায়, তিনি আবারও বাবা হয়েছেন। যদিও বাবার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না।
সেলিব্রিটিদের সন্তানেরা অবশ্য বড় হয়ে অ্যাবসেন্ট ফাদারদের ওপর একহাত নিয়েছেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এ নিয়ে একটি খবরও প্রকাশ করেছিল।
বেশি দূরে যেতে হবে না। হলিউডের আলোচিত জুটি ব্র্যাড পিট ও অ্যাঞ্জেলিনা জোলির ছয় সন্তানের কেউই পিটের সঙ্গে থাকেন না। ইতিমধ্যে চার সন্তানই বাবার নাম নিজেদের নাম থেকে মুছে ফেলেছে। এই সন্তানদের সঙ্গে পিটের কোনো সম্পর্কও নেই।
এই লেখার উদ্দেশ্য মহানায়কের ভুল ধরা নয়, বরং যাঁরা তাঁর ভক্ত অনুরাগী আছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া যে তাঁর মতো চুল রাখুন, পোশাক পরুন কিংবা জুতো। কিন্তু ভাবুন তো, আপনার আমার সন্তানকেও যদি টিভিতে গিয়ে নিজের পিতৃপরিচয়ের স্বীকৃতি নিতে হয়, তাহলে ব্যাপারটা কেমন বেদনার হবে?








