সেক্সিস্ট জোক ধর্ষণ-যৌন হয়রানির মতো ভয়ংকর অপরাধকে যেভাবে স্বাভাবিক করে তুলছে

জিনাত শারমিন
সেক্সিস্ট জোক ধর্ষণ-যৌন হয়রানির মতো ভয়ংকর অপরাধকে যেভাবে স্বাভাবিক করে তুলছে
ছবি: রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

ভারতের স্ট্যান্ড-আপ কমেডির সঙ্গে আমার পরিচয় লকডাউনে, ২০২০ সালের শেষে বা ২০২১ সালের শুরুতে। ঠিক মনে নেই। তখন বাসার ভেতর প্রতিটি দিন ছিল একই রকম। একটাই রং তার, ধূসর। সেই ধূসর দিনের ভার একটুখানি হালকা করেছিল জাকির খান আর সময় রায়না।

প্রযুক্তির কল্যাণে পরে আরও অনেকেই আমার ফিডে আসতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে পীযূষ শর্মা, বিশ্ব কল্যাণ নাথ, অমিত ট্যান্ডন, বরুণ গ্রোভার, মাধুর ভিরলি, বৈভব শেঠিয়াসহ অনেকেই ভারতের আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি) থেকে পড়াশোনা করেছেন। তারপর বিশ্বের সেরা কোনো আইটি কোম্পানির সিইও বা অন্য বড় পদে চাকরি না করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন কমেডিকে। তাঁদের এই (দুঃ)সাহস দেখে মন থেকে বাহবা দিই।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট আহমেদাবাদের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮ সালে ভারতীয় কমেডি ইন্ডাস্ট্রির বাজারের আকার ছিল মাত্র ৮০ থেকে ১০০ কোটি রুপির মধ্যে। আর মহামারিকাল পেরিয়ে ২০২৫ সালের শেষে সেই ইন্ডাস্ট্রির আকার দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫০০ কোটি রুপিতে। অর্থাৎ, মাত্র আট বছরে এই ইন্ডাস্ট্রি প্রায় ১৫ গুণ বড় হয়েছে।

যাই হোক, তাঁদের কোনো শোর নতুন পর্ব আপলোড হলে বা কোনো ক্লিপ ভাইরাল হলে অ্যালগরিদমের কল্যাণে আমার কাছেও নোটিফিকেশন চলে আসে।

হুট করেই মাসখানেক আগে চোখে পড়ল ভারতীয় কমেডিয়ান প্রণীত মোরের শোর একটি ক্লিপ। সেখানে দেখা যায়, শোতে উপস্থিত ওয়েব ডেভেলপার হিমাংশু জাংরা একটি জোক করার চেষ্টা করেন। তিনি যে ‘জোক’ করেন, সেটি সবিস্তারে উল্লেখ করার মতো রুচি ও বিবেচনা সুস্থ মানুষের থাকার কথা নয়।

যেটুকু না বললেই নয়, সেটুকুই বলি। তাঁর জোকটি ছিল এমন, প্রথম দিন ডেটে গিয়ে তিনি ৩৭০ রুপির বিরিয়ানি খাওয়ান। পরে সেই টাকা উসুল করতে ডেটের কাছ থেকে শারীরিক সুবিধা দাবি করেন। এই জোক শুনে অনেকেই হাসাহাসি করেন। এমনকি প্রণীত মোরেও।

প্রণীত মোরে ভারতের একজন জনপ্রিয় স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান ও ইউটিউবার। তিনি প্রধানত ‘ক্রাউড ওয়ার্ক’ কমেডির জন্য পরিচিত। তাঁর শোগুলো সাধারণত দর্শকের সঙ্গে সরাসরি মজার কথোপকথন ও তাৎক্ষণিক কৌতুকের ওপর নির্ভরশীল। ইউটিউবে তাঁর চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি। ইনস্টাগ্রামে তাঁকে অনুসরণ করেন ৩৮ লাখ মানুষ।

এই জোকটি হিমাংশু যে শোতে বলেন, সেটি অনুষ্ঠিত হয় ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল ভারতের গুরুগ্রামের ২৪ নম্বর সেক্টরের ডিএলএফ সাইবার হাবে। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রণীত মোর ওই মন্তব্য থামানোর বদলে হাসছেন, বরং আলোচনাকে উসকে দিচ্ছেন। তিনি এটিকে ‘পিক কনটেন্ট’ বলেও মন্তব্য করেন। পরে তিনি নিজেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।

তারপর কী হলো?

শোর ভিডিও একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করে, অন্যদিকে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ১০ ও ১১ জুন ভারতের জাতীয় মহিলা কমিশন (এনসিডব্লিউ) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিষয়টি আমলে নিয়ে প্রণীত মোর ও হিমাংশু জাংরাকে তলব করে। ১৩ জুন প্রণীত মোর প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। তিনি স্বীকার করেন, ওই মুহূর্তে তাঁর উচিত ছিল ওই ‘অতি উৎসাহী’ দর্শককে থামানো। ১৬ ও ১৭ জুন গুরুগ্রাম পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) দায়ের করে।

পুরো ঘটনায় ইতিবাচক দিক হলো, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, প্রতিক্রিয়া এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। ইতিমধ্যে প্রণীত মোরের যেসব শো পাইপলাইনে ছিল, সেগুলো স্থগিত করা হয়েছে।

এর সঙ্গে আমি আরও দু-একটি বিষয় যোগ করতে চাই।

সময় রায়না বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় কমেডিয়ানদের অন্যতম। তাঁর আয় প্রথম সারির অনেক বলিউড তারকার চেয়েও কম নয়। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর প্রথম ভাইরাল হওয়া একটি জোক ছিল অনেকটা এমন, ‘একদিন একটা লোক রেললাইনের পাশে একটা ছেলেকে ২০০ টাকা দিল। আরও কয়েকটি ছেলে এসে ওই ২০০ টাকা নিয়ে হুটোপুটি করতে থাকল। তখনই ট্রেন চলে এল। আর ছেলেটা ট্রেনের নিচে পড়ে গেল। ২০০ টাকায় লোকটার যা উসুল হলো।’

অনেক দিন পর্যন্ত আমি এই জোকটির কিছুই বুঝিনি। আমি প্রায়ই ভাবতাম, এর মধ্যে হাসির অংশটা কোথায়! এরপর একসময় ২০২৫ সালের নভেম্বর এল।

এপস্টেইন ফাইলও কীভাবে হাসি-তামাশার বিষয় হয়?

একের পর এক প্রকাশিত হতে থাকল এপস্টেইন ফাইলস। সেই সময় প্রবাসী বাংলাদেশি নারীবাদী লেখক নাদিয়া ইসলামের একটি পোস্ট পড়ে আমার মতো অনেকেই ডার্ক ওয়েব সম্পর্কে ধারণা পান। আমার মনে আছে, পোস্টটি পড়ে শারীরিকভাবে এতটাই অস্বস্তি আর খারাপ লেগেছিল যে আমি বমি করে দিয়েছিলাম। পরবর্তী কয়েক দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাওয়ার সাহসই পাইনি। ওই সময়ই আমি সময়ের ‘জোক’টির একটি সম্ভাব্য অর্থ বুঝতে পারি।

তন্ময় ভাট ইউটিউবে ‘মিম রিঅ্যাকশন’ নামে অন্য কমেডিয়ানদের নিয়ে একটি শো করতেন, এখনো করেন। সেখানেও বেশ কয়েকবার এপস্টেইন দ্বীপ নিয়ে জোক করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তখন আমি বুঝিনি। এখন আরও বেশি করে বুঝি না, এসব বিষয় কীভাবে হাসির খোরাক হতে পারে।

আবার একটি শোতে দেখছিলাম, একজন কমেডিয়ান হাসতে হাসতে বলছেন, ‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তোমার ভেতরে শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে ট্রমা, অ্যাংজাইটি আছে। ছোটবেলায় নিশ্চয়ই কেউ "ব্যাড টাচ" করেছে (কোই না কোই তো ছুয়া হোগা...)।’

সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়াজ গট লেটেন্ট’-এর দ্বিতীয় সিজনের প্রথম পর্বে, যেখানে বলিউড তারকা আলিয়া ভাট উপস্থিত ছিলেন এবং যা ইউটিউবে কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে, অভিনাশ আগারওয়াল নামে একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প সেজে মঞ্চে পারফর্ম করেন। তিনিও ‘তেল’ আর ‘দ্বীপ’ নিয়ে একটি সেক্সিস্ট, মিসোজিনিস্ট জোক করেন।

এই ধরনের জোকের সমস্যা কোথায়?

সেক্সিস্ট, নারীবিদ্বেষী বা নারী ও শিশুদের বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে করা কৌতুক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও গণমাধ্যম গবেষণায় আলোচনা হচ্ছে।

গবেষকদের মতে, একটি কৌতুক একাই সমাজ বদলে দেয় না। তবে বারবার একই ধরনের কৌতুক শোনা এবং সেগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করে।

প্রথমত, যখন বারবার নারী ও শিশুদের নিয়ে অপমানজনক বা যৌনতাপূর্ণ কৌতুক করা হয়, তখন বৈষম্য এবং নারী ও শিশুদের ‘যৌনবস্তু’ হিসেবে দেখাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়। অনেকেই তখন সেগুলোকে ‘এ তো কেবল মজা’ বলে উড়িয়ে দেন।

দ্বিতীয়ত, এটি নারীকে বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। যেসব কৌতুকে নারীদের শুধু শারীরিক আকর্ষণ বা যৌনতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, সেসব ক্ষেত্রে মানুষ নারীদের ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা বা মতামতের বদলে তাঁদের শরীরকে বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে। একে বলা হয় অবজেক্টিফিকেশন বা বস্তুকরণ। নারী, পুরুষ বা শিশু, কারও শরীরই কি হাসির খোরাক হতে পারে?

তৃতীয়ত, অপরাধ ও হয়রানিকে তুচ্ছ করে দেখার ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি যৌন হয়রানি বা জবরদস্তিকে হাস্যরসের বিষয় বানানো হয়, তাহলে এসব আচরণের গুরুত্ব কমে যেতে পারে। অপরাধকে তখন আর অপরাধের দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা থাকে না। বরং ‘ফান’ বা তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে।

চতুর্থত, এটি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি করে। যেসব নারী বা অন্য কেউ আগে হয়রানির শিকার হয়েছেন, তাঁদের কাছে এ ধরনের কৌতুক অস্বস্তিকর বা মানসিকভাবে কষ্টদায়ক হতে পারে। সুপ্ত থাকা ট্রমাও ফিরে আসতে পারে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে কি যা খুশি তাই বলা যাবে?

স্ট্যান্ড-আপ কমেডির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিতর্কিত বিষয় নিয়েও রসিকতা করা। ‘ডার্ক কমেডি’র পরিসরে থেকে কমেডির সীমাকে একটু একটু করে বাড়ানো। অনেক কৌতুকশিল্পী মনে করেন, হাস্যরসের স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে মনোবিজ্ঞানী, গবেষক ও সমালোচকদের মতে, হাস্যরসের স্বাধীনতা থাকলেও অন্যের মর্যাদা, সম্মতি বা মানবিক অধিকারকে খাটো করার অধিকার কারও নেই।

এগুলো কেবল নৈতিক মানদণ্ডেই নয়, আইনগতভাবেও দণ্ডনীয় অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়। ভারতের কমেডি ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধরনের জোকের সংখ্যা হয়তো শতকরা ৫ ভাগেরও কম। কিন্তু বিষয়টি অনেকটা গাড়ির ইঞ্জিন বা মানুষের সততার মতো। হয় সেটি শতভাগ কার্যকর, নয়তো নয়। ৯৫ শতাংশ ভালো ইঞ্জিন বা ৯৫ শতাংশ সৎ মানুষ বলে বাস্তবে কিছু নেই। এই ধরনের জোক সংখ্যায় কম হলেও এর প্রভাব গুরুতর। এগুলো একদিকে যেমন সমাজে নেতিবাচকতা ছড়ায়, অন্যদিকে পুরো কমেডি ইন্ডাস্ট্রিকেও প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করে তোলে।