নারী তাঁর নিজের ঘরেও কেন নিরাপদ নয়

কক্সবাজারের মাতামুহুরীতে ডাকাতির সময় এক মা ও তাঁর কিশোরী কন্যার ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধের বিবরণ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা। কারণ এই ঘটনায় লুটপাটের চেয়েও ভয়ংকর হলো সেই বার্তা, যা অপরাধীরা রেখে গেছে—একজন নারী তাঁর নিজের ঘরেও নিরাপদ নন।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষের ঘরই নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়। বাইরে যত অনিশ্চয়তা থাকুক, মানুষ বিশ্বাস করে যে নিজের ঘরে অন্তত সে সুরক্ষিত। কিন্তু যখন একদল সশস্ত্র ব্যক্তি সেই ঘরে ঢুকে শুধু সম্পদ লুট করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং মা ও কন্যার ওপর সংঘবদ্ধ যৌন সহিংসতা চালায়, তখন বিষয়টি আর সাধারণ অপরাধের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি আইনের শাসনের প্রতি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ এবং মানবিক মর্যাদার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক নির্মম আক্রমণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ধর্ষণকে আমরা প্রায়ই একটি যৌন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করি। কিন্তু বাস্তবে ধর্ষণ খুব কম ক্ষেত্রেই যৌন আকাঙ্ক্ষার বিষয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যুদ্ধ, দাঙ্গা, জাতিগত নিপীড়ন কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা—সব ক্ষেত্রেই নারীর শরীরকে নিয়ন্ত্রণ, অপমান এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ নারীকে আঘাত করলে শুধু একজন মানুষ আক্রান্ত হন না; আক্রান্ত হয় একটি পরিবার, একটি সামাজিক সম্পর্কের জাল।
এই কারণেই নারীরা বারবার সহিংসতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। অপরাধীরা জানে, একজন মানুষকে হত্যা করলে একটি জীবন শেষ হয়; কিন্তু একজন নারীর ওপর যৌন সহিংসতা চালালে তার অভিঘাত বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এখানেই রাষ্ট্রের দায়ের প্রশ্নটি অনিবার্যভাবে সামনে আসে। আধুনিক রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নৈতিক ভিত্তিই হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন নাগরিক তাঁর স্বাধীনতার একটি অংশ রাষ্ট্রকে সমর্পণ করেন এই বিশ্বাসে যে রাষ্ট্র তাঁকে সহিংসতা থেকে রক্ষা করবে। ফলে যখন একজন নারী নিজের ঘরে থেকেও নিরাপদ থাকেন না, তখন সেটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থারও ব্যর্থতা।
আমরা প্রায়ই শুনি, অপরাধী গ্রেপ্তার হয়েছে, মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এমন অপরাধ বারবার ঘটছে? কেন অপরাধীরা এতটা দুঃসাহসী? এর উত্তর খুঁজতে গেলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রতিরোধব্যবস্থা এবং আইনের অসম প্রয়োগের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। অপরাধীরা যখন বিশ্বাস করতে শেখে যে শাস্তি অনিশ্চিত, তখন যেকোনো ধরনের সহিংসতা তাদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ নয়, বরং স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
মাতামুহুরীর এই ঘটনা তাই কেবল কক্সবাজারের একটি ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং নারীর প্রতি আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি অপ্রত্যাশিত উদাহরণ। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচার অবশ্যই জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা—কেন একজন নারী এখনও তাঁর নিজের ঘরেও নিরাপদ নন?
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সড়ক, সেতু বা অর্থনৈতিক সূচকে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তার প্রকৃত পরিমাপ হয় সেখানে নারী, শিশু এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকরা কতটা নিরাপদ—তার ওপর। মাতামুহুরীর এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, এই পরীক্ষায় আমরা এখনও উত্তীর্ণ হতে পারিনি।
শাহিনা ফেরদৌসী, সহকারী অধ্যাপক, প্রাইম ইউনিভার্সিটি।








