একটি ভাইরাল মুহূর্ত এবং গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ

আমরা সাধারণত এর উত্তর খুঁজি সংবিধানে, নির্বাচনে, সংসদে কিংবা ভোটাধিকারে। কেউ আইনের শাসনের কথা বলেন, কেউ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার। কিন্তু আমার মনে হয়, এই উত্তরগুলো অসম্পূর্ণ। কারণ মানুষ প্রথমে নাগরিক হয় না; প্রথমে সে একটি সম্পর্কের ভেতর জন্ম নেয়। রাষ্ট্র তাকে পরে চেনে, পরিবার তাকে আগে চেনে। ভোট দেওয়ার বহু আগেই সে শিখে, কার কথা শোনা হয়, কার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কার শ্রম দৃশ্যমান, আর কার অবদান এতটাই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয় যে তাকে আলাদা করে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনই অনুভূত হয় না। এই কারণেই আমার প্রশ্নটি অন্যত্র। গণতন্ত্র কি সত্যিই সংসদে শুরু হয়, নাকি পরিবারের ভেতরে?
সম্প্রতি বাংলাদেশের জনপরিসরে দুটি ছোট্ট মুহূর্ত অসাধারণ সামাজিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একটিতে দেখা গেল, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃষ্টির মধ্যে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের মাথার ওপর ছাতা ধরে হাঁটছেন। অন্য এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বললেন, “আমার মাথায় হেলথ নেই, উনি আছেন।” বাক্যটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর। মুহূর্তের মধ্যেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ একে ভালোবাসার প্রকাশ বললেন, কেউ রাজনৈতিক কৌশল, কেউ ব্যঙ্গ করলেন, আবার কেউ দাম্পত্যের সৌন্দর্য হিসেবে দেখলেন।
কিন্তু একজন সমাজবিজ্ঞানীর কাছে ঘটনাটির গুরুত্ব অন্যত্র। প্রশ্নটি এই নয়, তিনি কী অনুভব করছিলেন। প্রশ্নটি হলো, সমাজ কী দেখল? কারণ সমাজ কেবল একটি ছাতা দেখে না; সমাজ প্রতীক পড়ে। কেবল একটি বাক্য শোনে না; সম্পর্কের নৈতিক ভাষাও পড়ে। কখনো কখনো একটি ক্ষুদ্র অঙ্গভঙ্গি এমন এক সামাজিক আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করে, যার অভাব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনুভব করে এসেছে।
আমি এই মুহূর্তগুলোকে কোনো ব্যক্তির চরিত্রের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে পড়তে চাই না; রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিরোধিতার আলোয়ও নয়। বরং এগুলোকে আমি একটি সাংস্কৃতিক আয়না হিসেবে দেখি। সেই আয়নায় আমরা একজন রাজনীতিকের চেয়ে বেশি দেখি নিজেদের সমাজকে, আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের পুরুষত্ব, আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতি এবং আমাদের গণতান্ত্রিক কল্পনাকে।
সম্ভবত মানুষ সেখানে শুধু ভালোবাসা দেখেনি; তারা স্বীকৃতির সম্ভাবনা দেখেছে।
আর এখানেই ভালোবাসা ও স্বীকৃতির পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
ভালোবাসা একটি অনুভূতি। কিন্তু স্বীকৃতি একটি নৈতিক অবস্থান। ভালোবাসা মানুষকে কাছে আনে; স্বীকৃতি তাকে সমান মর্যাদায় দাঁড় করায়। ভালোবাসা ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু স্বীকৃতি কখনোই পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। কারণ স্বীকৃতি নির্ধারণ করে, আমরা কাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখি, কার বিচারবোধে আস্থা রাখি এবং কার পরিচয়কে কোনো সম্পর্কের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করি না।
অর্ধাঙ্গী: যে প্রশ্নটি এখনও শেষ হয়নি
এক শতাব্দীরও বেশি আগে বেগম রোকেয়া একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছিলেন। সমাজ নারীকে অর্ধাঙ্গিনী বলে সম্মান করে, কিন্তু সেই সম্মানের ভেতরে কি সত্যিই সমমর্যাদা আছে? যদি তিনি সত্যিই অর্ধাঙ্গ হন, তবে সিদ্ধান্তে তিনি অর্ধেক নন কেন? কেন তাঁর শ্রম স্বাভাবিক, অথচ তাঁর বিচারবোধ ব্যতিক্রম?
রোকেয়ার আপত্তি ভালোবাসার বিরুদ্ধে ছিল না; ছিল এমন এক সম্পর্কের বিরুদ্ধে, যেখানে স্নেহ আছে কিন্তু সমতা নেই, যত্ন আছে কিন্তু স্বীকৃতি নেই। তিনি বুঝেছিলেন, মানুষকে ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; তাকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকার করাও জরুরি। আজ আমরা যাকে recognition বলি, রোকেয়া সেই ভাষা ব্যবহার করেননি; কিন্তু সেই সংকটটিকেই অসাধারণ স্পষ্টতায় দেখেছিলেন।
সম্ভবত এই কারণেই সাম্প্রতিক সেই ভাইরাল মুহূর্তগুলো এত মানুষের মনোযোগ কেড়েছে। মানুষ সেখানে কেবল দাম্পত্যের কোমলতা দেখেনি; দেখেছে এমন একটি সম্ভাবনা, যেখানে একজন নারীকে তাঁর সম্পর্কের পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর জ্ঞান, পেশা ও বিচারবোধসহ দেখা হচ্ছে।
ভালোবাসা নয়, স্বীকৃতি: সম্পর্কের নৈতিকতা
ভালোবাসাকে আমরা সম্পর্কের সর্বোচ্চ গুণ বলে মনে করি। কিন্তু ভালোবাসা সব সময় সমতার নিশ্চয়তা দেয় না। ইতিহাস বলে, মানুষ ভালোবেসেও অন্যের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করেছে; যত্ন নিয়েও তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়নি। এই কারণেই সম্পর্কের নৈতিকতা বোঝার জন্য স্বীকৃতির ধারণা অপরিহার্য।
চার্লস টেইলর দেখিয়েছেন, স্বীকৃতি মানুষের মর্যাদার মৌলিক শর্ত। অ্যাক্সেল হনেথ দেখিয়েছেন, আত্মমর্যাদাও গড়ে ওঠে অন্যের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে। আর ন্যান্সি ফ্রেজারের ভাষায়, অবিচার শুধু সম্পদের অসম বণ্টনে নয়; অবিচার তখনও ঘটে, যখন কোনো মানুষের জ্ঞান, পরিচয় বা অবদানকে ধারাবাহিকভাবে কম মূল্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পারিবারিক বাস্তবতায় এই তত্ত্বগুলো তাই অদ্ভুতভাবে পরিচিত।
অনেক নারী ভালোবাসা পান, কিন্তু সব সময় স্বীকৃতি পান না। তাঁকে পরিবারের কেন্দ্র বলা হয়, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্র করা হয় না। তাঁর যত্নকে স্বাভাবিক ধরা হয়, কিন্তু তাঁর পেশাগত পরিচয় বা বিচারবোধকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই কারণেই জনপরিসরে যখন একজন পুরুষ তাঁর সঙ্গীকে কেবল স্ত্রী হিসেবে নয়, একজন চিকিৎসক, একজন চিন্তাশীল মানুষ কিংবা একজন পেশাজীবী হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেন, তখন সেটি নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা থাকে না; সেটি একটি সাংস্কৃতিক সংকেতে পরিণত হয়। কারণ সেখানে দৃশ্যমান হয় সম্পর্কের নৈতিক ব্যাকরণ।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনো এক ব্যক্তিকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি আমাদের।
আমরা কি আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদের তাঁদের ভূমিকার জন্য মূল্য দিই, মা, স্ত্রী, স্বামী কিংবা বাবা হিসেবে? নাকি তাঁদের ব্যক্তিসত্তা, জ্ঞান ও সক্ষমতার জন্যও স্বীকৃতি দিই? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে একটি সম্পর্ক কতটা মানবিক, একটি পরিবার কতটা ন্যায়ভিত্তিক, এবং একটি সমাজ কতটা গণতান্ত্রিক।
কারণ গণতন্ত্র সংসদে জন্ম নেয় না। সংসদ তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ মাত্র। গণতন্ত্রের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার; প্রথম অনুশীলন সম্পর্ক; আর তার প্রথম ভাষা স্বীকৃতি।
যে শিশু বড় হতে হতে দেখে একজন মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও বিচারবোধকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়, সে-ই পরে অন্য নাগরিকের অধিকারকে সম্মান করতে শেখে। তাই যে সমাজ পরিবারে সমতার অনুশীলন করে না, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিও দীর্ঘদিন অপূর্ণ রাখে।
আমি একে ‘সম্পর্কভিত্তিক গণতন্ত্র’ (Relational Democracy) বলতে চাই। এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন, আমরা একে অপরকে কীভাবে দেখি? কেবল কোনো সম্পর্কের ভূমিকায়, নাকি পূর্ণ মানুষ হিসেবে? রাষ্ট্র পরে নাগরিককে সমান অধিকার দেয়; কিন্তু পরিবারই প্রথম শেখায় কার কণ্ঠস্বর শোনা হবে, কার বিচারবোধে আস্থা রাখা হবে, কার শ্রমের মূল্য দেওয়া হবে এবং কাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। সেই অর্থে গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ ভোট নয়; স্বীকৃতি।
যে শিশু বড় হতে হতে দেখে একজন মানুষের জ্ঞান, শ্রম ও বিচারবোধকে সমান মর্যাদা দেওয়া হয়, সে-ই পরে অন্য নাগরিকের অধিকারকে সম্মান করতে শেখে। তাই যে সমাজ পরিবারে স্বীকৃতি ও সমতার অনুশীলন করে না, সে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিও দীর্ঘদিন অপূর্ণ রাখে। সম্ভবত এ কারণেই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ শুধু সংসদে নয়; প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যেও নির্মিত হয়।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়








