তিন তালাক রদ, নারীমুক্তি না মোদীর চাল?

আশওয়াক মাসুদি
তিন তালাক রদ, নারীমুক্তি 
না মোদীর চাল?
ছবি: সংগৃহীত

নারী মুক্তির ভাষা বহুদিন ধরেই যুদ্ধ বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে ইরানি নারীদের “রক্ষা” করার যে যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে, সেটিও একই কাঠামোর অংশ। প্রশ্ন হলো, এসব দাবির মাধ্যমে আসলে কার স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে?

ভারতের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যাদের নারী অধিকার বা বিশেষ করে মুসলিম নারীদের সমতার প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। দলটি হঠাৎ করেই “নারী মুক্তি”র ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করে। তারা এমন একটি প্রথা বাতিলের উদ্যোগ নেয়, যেখানে মুসলিম পুরুষরা “তিন তালাক” শব্দ তিনবার উচ্চারণ করেই তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারতেন।

২০১৬–১৭ সালের দিকে বিজেপির এই “তিন তালাক” বিরোধী উদ্যোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তখন আমি নিজেও একটি ভারতীয় সংবাদপত্রে কাজ করতাম। সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে জেন্ডারভিত্তিক প্রতিবেদনের জন্য আলাদা একটি পাতা চালু করা হয়েছিল। সাধারণভাবে বিষয়টি সংবাদ কাভারেজে গুরুত্ব পাওয়া ইতিবাচক মনে হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল জটিল। কারণ বিজেপি এই সংস্কারকে মুসলিম নারীদের, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র নারীদের ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছিল।

২০২৪ সালে উত্তর ভারতে এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, “তিন তালাক প্রথা বন্ধ করে আমরা পুরো মুসলিম পরিবারকে রক্ষা করেছি… আগামী কয়েক শতাব্দী ধরে মুসলিম কন্যারা মোদিকে আশীর্বাদ করবে।”

কিন্তু এই বক্তব্যের বাইরে বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। যে দলটির বিরুদ্ধে মুসলিমবিদ্বেষের অভিযোগ দীর্ঘদিনের, তারা হঠাৎ করে মুসলিম নারীদের মুক্তি নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে—এটা অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ মনে হয়েছে।

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মোদি বারবার, কখনো সরাসরি আবার কখনো ইঙ্গিতে, মুসলিমদের “অনুপ্রবেশকারী” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দাবি করেছেন তারা ভারতের সম্পদ “লুট” করতে পারে। তিনি ও তাঁর দল প্রায়ই এমন ধারণা তুলে ধরেছেন যে মুসলিমদের জন্মহার বেশি এবং তারা কৌশলে জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বদলে দিতে চায়। একই সঙ্গে একটি প্রচলিত ষড়যন্ত্র তত্ত্বও রাজনৈতিক বক্তৃতায় উঠে এসেছে—যেখানে বলা হয় মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তর ঘটাচ্ছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডাব্লিউ) ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনী প্রচারণা বিশ্লেষণেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটি মোদির ১৭৩টি নির্বাচনী ভাষণ পর্যালোচনা করে দেখে, এর মধ্যে ১০০টিরও বেশি ভাষণে মুসলিমবিদ্বেষী মন্তব্য ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে “তিন তালাক” ইস্যু যখন রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রে চলে আসে, তখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যায়। এই সংস্কার কি সত্যিই মুসলিম নারীদের নিজেদের দাবি থেকে এসেছে? এটি কি তাদের বাস্তব সমস্যার মূল সমাধান ছিল?

সমালোচকদের মতে, এই আইন আসলে নারীর ক্ষমতায়নের চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণের একটি অংশ। মুসলিম পুরুষদের “অনগ্রসর” বা “বর্বর” হিসেবে উপস্থাপন করে জনমনে ক্ষোভ তৈরি করা এর একটি উদ্দেশ্য হতে পারে বলেও অনেকে মনে করেন। কারণ এই আইন শুধু বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়াকে অপরাধ হিসেবে দেখায়নি, বরং এটিকে ফৌজদারি অপরাধে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে ভারতে এখনো বৈবাহিক ধর্ষণকে (marital rape) অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, এই বাস্তবতা নারী অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের দ্বৈততাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে একটি বড় শিক্ষা উঠে আসে: ক্ষমতাবানদের তৈরি করা কাঠামোর ভেতরে নারী অধিকারকে সীমাবদ্ধ করলে বাস্তব সমস্যাগুলো আড়ালে থেকে যায়।

একই ধরনের বয়ান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দেখা যায়, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। সেখানে “নারীর মুক্তি”, “স্বাধীনতা” বা “শাসন পরিবর্তন”-এর মতো শব্দগুলো সামরিক হস্তক্ষেপকে নৈতিকভাবে বৈধতা দেওয়ার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

যুদ্ধ শুরুর পরপরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত এই ধারণা ছড়িয়ে পড়ে যে ইরানি নারীদের “রক্ষা” করার জন্য সামরিক পদক্ষেপ জরুরি। ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে একরৈখিকভাবে উপস্থাপন করে এই বয়ানকে আরও শক্তিশালী করা হয়।

যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে The Jerusalem Post তাদের প্রথম পাতায় একটি ছবি প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় একজন ইসরায়েলি ফাইটার পাইলট হিজাব পরা এক ইরানি নারীর হাত ধরে আছেন। শিরোনাম ছিল—“নারী, জীবন, স্বাধীনতা: ইসরায়েলি পথ।”

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বারবার ইরানি নারীদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুনে তিনি এক ভাষণে বলেন, “এটা আপনাদের সুযোগ সোচ্চার হওয়ার… নারী, জীবন, স্বাধীনতা।”

এই ধরনের বক্তব্য বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি একটি ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ, যেখানে নারী অধিকারকে ব্যবহার করা হয় ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য, নারীর বাস্তব ক্ষমতায়নের জন্য নয়।

ক্ষমতাধরদের এই ধরনের বয়ান হোক তা ট্রাম্প বা নেতানিয়াহুর ইরানবিষয়ক মন্তব্য, কিংবা বিজেপির “তিন তালাক” যুক্তি সবকিছুই সাংবাদিকদের গভীরভাবে যাচাই করার দাবি রাখে। কেবল তা হুবহু পুনরাবৃত্তি করা সাংবাদিকতার কাজ নয়।

নারী অধিকার নিয়ে প্রতিবেদন করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে দেখতে হবে কার কণ্ঠস্বর সামনে আনা হচ্ছে, কারা বাদ পড়ছে এবং কোন রাজনৈতিক স্বার্থ এই ভাষা তৈরি করছে। সাংবাদিকতার দায়িত্ব শুধু নিরপেক্ষ থাকা নয়, বরং ক্ষমতার তৈরি বয়ানকে প্রশ্ন করা।

বিজেপির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, যে সংস্কারগুলো বাইরে থেকে প্রগতিশীল মনে হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবে সামাজিক বিভাজন বাড়াতেও ভূমিকা রেখেছে। অনেকেই তখন যুক্তি দেন, নারীর প্রকৃত উন্নয়ন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া আইন দিয়ে নয়, বরং সমাজের ভেতরের পরিবর্তনের মাধ্যমে হওয়া উচিত।

ইরান নিয়ে বর্তমান মার্কিন–ইসরায়েলি পরিস্থিতিও একই প্রশ্ন সামনে আনে—কোন ধরনের “মুক্তি”কে আমরা সামনে আনছি, আর কার অভিজ্ঞতা আড়ালে থেকে যাচ্ছে?

নারীর শরীর বহুদিন ধরেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে আছে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কীভাবে ক্ষমতাধররা নারীর প্রশ্নকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে—নারীর মুক্তির জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার জন্য।

*বার্লিন ভিত্তিক স্বাধীন সাংবাদিক আশওয়াক মাসুদি একজন নিম্যান ফেলো।সবশেষ কাজ করেছেন গ্লোবাল প্রেস জার্নালের লিড এ (এশিয়া) হিসেবে।

**ইংরেজি থেকে অনুবাদ, ঈষৎ সম্পাদিত