কোক স্টুডিওর মেঘঃ এক্সপেরিমেন্ট আর বিকৃতির থিন লাইন কোথায়?

রবি ঠাকুরের কবিতা আছে ঢের। সেগুলোর মধ্যে “সোনার তরী” কবিতাটি বোধহয় সবচাইতে জানা-শোনাগুলোর একটি। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে দীর্ঘসময় ধরে পাঠ্য থাকায় কবিতা বিমুখদের কাছেও অপরিচিত নয় এটি। কবিতাটির গভীর দর্শন বা জীবনবোধের ব্যাখ্যা মুখস্ত করতে গিয়ে নাকাল হওয়াদের সংখ্যাও বোধহয় কম হবে না এ মুল্লুকে। সেই “সোনার তরী” এবার নতুন করে আলোচনায় এলো অনলাইন মিউজিক স্ট্রিমিং ফ্র্যানচাইজি কোক স্টুডিও বাংলার বদৌলতে।
তাদের সর্বশেষ প্রকাশিত “মেঘ” শিরোনামের গানটিতে এই কবিতার অংশবিশেষের নিরীক্ষামূলক বা এক্সপেরিমেন্টাল ব্যবহার নিয়ে অনলাইন-অফলাইনে চলছে তুমুল বিতর্ক।
বাংলাভাষী শ্রোতাদের সামনে রবি ঠাকুর বা নজরুলের গান নিয়ে কোনো এক্সপেরিমেন্ট বা নতুন করে কাজ করার চেষ্টা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হিসবেই প্রমাণিত হয়েছে বারবার। এই ঘরানার গানের সমঝদার ও নিয়মিত শ্রোতাদের বরাবরই কট্টরপন্থী বলে ধরে নেওয়া হয়। গানের মূল সুর আর স্বরের উপস্থাপনায় একটু এদিক সেদিক হলেই তারা মনক্ষুণ্ণ হয়। ক্ষুব্ধ হয়ে তেড়েও আসেন কেউ কেউ।
নব্বই দশকের শেষ দিকে ‘ফিডব্যাক’ ব্যান্ডের ভোকাল মাকসুদ তাঁর “ওগো ভালোবাসা” অ্যালবামের জন্যে জনপ্রিয় রবীন্দ্র সংগীত ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়’ গেয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। অভিযোগ ছিল, তাঁর রক ধাঁচের ফিউশন গায়কীতে গানটির মৌলিকত্ব ও সুর বিকৃত হয়েছে। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক সে সময় এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন জনকণ্ঠে কলাম লিখে। পালটা কলাম লিখে সেটির প্রতিউত্তরও করেছিলেন মাকসুদ। আমাদের শিল্পাঙ্গন বেশকিছুদিন বেশ সরগরম ছিল ইস্যুটি নিয়ে।
হিরো আলমের রবীন্দ্র সংগীত গাওয়া নিয়ে হালের বিতর্কটি অনেকেরই মনে আছে আশা করি। তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙ্গে ‘আমারও পরাণ যাহা চায়’ গেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনার জন্ম দেন। রবি ঠাকুরের গান বিকৃতির ‘অভিযোগে’ তাঁকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। তখন ভবিষ্যতে আর কখনো রবীন্দ্র বা নজরুল সংগীত গাইবেন না, এই মর্মে মুচলেকা দিয়ে প্রায় আট ঘন্টা পর তিনি ছাড়া পান তিনি।
রবীন্দ্র বা নজরুল সংগীত নিয়ে এক্সপেরিমেন্টের ক্ষেত্রে সমালোচনার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই তাই এগোতে হয়।
তবে সাধারণ শ্রোতাদের হিসাব কিছুটা আলাদা। “নতুন করে পাব বলে” অ্যালবামে আধুনিক সংগীত আয়োজনের সাথে সহজ-সুন্দর করে রবি ঠাকুরের গান গাওয়ার চেষ্টা শিল্পী সাহানা বাজপেয়ীকে তরুণ শ্রোতাদের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়। বাংলাদেশি ব্যান্ড শিরোনামহীনের রবি ঠাকুরকে নিয়ে করা অ্যালবাম “শিরোনামহীন রবীন্দ্রনাথ”-ও শ্রোতাপ্রিয় হয়েছিল বিতর্ককে পাশ কাটিয়ে।
কিন্তু কোক স্টুডিওর “মেঘ”, কট্টর বা সাধারণ দুইপক্ষকেই ক্ষেপিয়ে তুলেছে। অন্তত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলাপে-সংলাপে সেটাই প্রতীয়মান। প্রকাশের দুইদিনের মধ্যে কোক স্টুডিওর ইউটিউব চ্যানেলে গানটির নিচে মন্তব্য জমা পড়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার, যার প্রায় সবই নেতিবাচক। ফেইসবুকেও বইছে সমালোচনার ঝড়।
তো কী ছিল সেই গানে?
আষাঢ় মাসকে উদযাপনে সায়ান চৌধুরী অর্ণবের আয়োজনে ছয় মিনিটের গানটিতে মূল শিল্পী তিনজন। স্মরণ দত্তের কথায় মোহাম্মদ শোয়েবের শাস্ত্রীয় সুরে শুরু হয় পরিবেশনাটি। এরপর পর মঞ্চে আসেন শিল্পী মাশা, গেয়ে শোনান অর্ণবের ‘কোনোদিন’ গানটি, নতুন সুর ও আয়োজনে। তারপর শিল্পী মৌসুমীর সারগমের সমন্বয়ে গানটি এগিয়ে যায়। এ পর্যায়ে স্ল্যাম পোয়েট্রি ও র্যাপ সংগীতের সমন্বিত ঢংয়ে সামনে আসে “সোনার তরী” কবিতার অংশবিশেষের হাই এনার্জি, ছন্দময় উপস্থাপনা। শেষে আবার শাস্ত্রীয় সুরের কোরাসে শেষ হয় মেঘ শিরোনামের গানটি।
মঞ্চসজ্জার মুন্সিয়ানায় আসলেই আষাঢ় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বানিয়ে তোলা স্টুডিওর ভেতর। কালো গমগমে মেঘে ছাওয়া ব্যাকড্রপ শান্ত কোনো গ্রামের নদীর ধারে নিয়ে যায়। হঠাত বিদ্যুতের চমকে চমকে উঠি যেন। পুরো অভিজ্ঞতাটাই বেশ মনে রাখবার মতো। কিন্তু যেটি নিয়ে আয়োজন, সেই গানটি তেমন স্পর্শ করতে পারেনি আমাকেও।
অর্ণবের জনপ্রিয় গান, ‘কোনোদিন’ এর এই রেন্ডিশন, মূল গানটির চাইতে অনেক দুর্বল মনে হয়েছে। মূলটির মতোন করে মনে লাগেনি।
আর সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে “সোনার তরী” লিরিকাল পরিবেশনাটি। ‘সোনার তরী’ কবিতার মূলভাবের সংগে শিল্পীদের গায়কী কোথাও ঠিক মিশ খায়নি। এমন ভারী ও গভীর বোধের একটি কবিতা নিয়ে সংগীত পরিবেশনার সময় শিল্পীদের হাসিহাসি মুখগুলো কেমন খাপছাড়া বলে বোধ হয়। যেন তারা অর্থ না বুঝে অথবা গভীর অর্থের তোয়াক্কা না করেই শুধু গাওয়ার জন্যেই গেয়ে গেলেন। তাতে রবি ঠাকুরের অসম্মান হলো কিনা, সেই আলাপে যাব না। তবে কবিতার ভাবের যে বিকৃতি ঘটেছে, তাতে তেমন সন্দেহ নেই। কালের গর্ভে ব্যক্তি মানুষের হারিয়ে যাওয়া, কেবল তাঁর কর্মের টিকে থাকা- এই গভীর দার্শনিকতা নিয়ে যে পংক্তিমালা, সেটিকে অন্তত হেসেখেলে গাওয়ার সুযোগ নেই। এই আয়োজনে আরও একটু সতর্কতার দরকার ছিল।
তাই বলে আমি এক্সপেরিমেন্টের বিপক্ষে নই। কোক স্টুডিও র অনেক নিরীক্ষাধর্মী কাজই শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। সেগুলোর জন্যে অভিবাদন।
মোটাদাগে “মেঘ” শ্রোতাদের মনকে টানতে পারেনি। উসকে দিয়েছে সেই পুরনো বিতর্ক, শিল্প কি শিল্পের খাতিরেই চলবে নাকি এর সাথে দর্শক-শ্রোতার সংযোগ সাধন হলেই কেবল সেটি সার্থক হয়। এক্সপেরিমেন্ট কতদূর চলতে পারে বা কখন আসলে নিরীক্ষা বিকৃতিতে রূপ নেয়! তর্ক চলছে। শিল্পের খাতিরেই এ তর্ক চলুক।
লেখক: মুশফেকা ইসলাম, লেকচারার, ডিপার্টমেন্ট অফ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ইন্ডিপেন্টেন্ড ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)








