বহুবিবাহ প্রসঙ্গে ইসলাম আসলে কি বলে?

শুভ্রা মারিয়াম
বহুবিবাহ প্রসঙ্গে ইসলাম আসলে কি বলে?
শুভ্রা মারিয়াম শিক্ষক, আলেম ও লেখক

বেশ কিছুদিন ধরে সমাজ মাধ্যম বহুবিবাহ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। যদিও বাংলাদেশে এখনও বহুবিবাহকে ভালো চোখে দেখা হয়না, তারপরও

দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বিয়ের সমর্থনে জোরদার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

এই প্রেক্ষাপটে রোকেয়া কালেকটিভ কথা বলেছে শিক্ষক ও আলেম শুভ্রা মারিয়ামের সঙ্গে। পাঠকদের কাছে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হলো।

ইদানীং পুরুষের একাধিক বিয়ে নিয়ে সমাজমাধ্যমে চর্চা হচ্ছে। বহুবিবাহের পক্ষে বিপক্ষে, মানবিকতা ও যুক্তি, ধর্ম ও সামাজিক নানা লেন্সে আলাপ আলোচনা হচ্ছে।

বিষয়টা একদিক থেকে অবশ্য ভালো মনে হয়, কারণ এই সুযোগে নতুন করে আবার ঘুরে দেখার, ভাবার ও জানার সুযোগ তৈরি হয়। গল্পে আড্ডায় শেখার মতোন অনেকটা।

ইসলামে শেখা, জানা, চিন্তা ও অনুধাবন ইত্যাদি বিষয় কে সবসময় উৎসাহিত করা হয়েছে।

প্রথমত ইসলামে কি একাধিক বিয়ে বৈধ?

আল্লাহ পবিত্র কোরআনে প্রয়োজনের খাতিরে আদল বা সুবিচার নিশ্চিত করণ সাপেক্ষে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছেন।

এ সম্পর্কিত আয়াত নাজিল হয়েছিল উহুদ যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে। তবে এই আয়াত নাযিল হওয়ার আগেও বহুবিবাহের প্রচলন ও স্ত্রীদের মধ্যে যথাযথ সমতা রক্ষা না করা এবং এতিম কন্যার সম্পত্তির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হবার বিষয়টা

সমাজে বিদ্যমান ছিলো।

তাই শুধুমাত্র ওই সময়ের জন্য বিধান টি নির্দিষ্ট নয়। এটা সার্বজনীন।

মূলত, আয়াতটি নাযিল হয়েছিল অনাথ কন্যা ও বিধবা নারী এবং একাধিক স্ত্রী সহ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ নারী এদের সুরক্ষার জন্যই। সুবিচার নিশ্চিতে।

প্রশ্ন উঠতে পারে সুবিচার বা আদল কী?

প্রথমত, একাধিক স্ত্রীর মধ্যে যথাযথ সমতা নিশ্চিত করার মত আর্থিক সামর্থ্য থাকা।

তাদের ভরণপোষণ, আলাদা বাড়ি সহ যা যা প্রয়োজন সব কিছু নিশ্চিত করার সামর্থ্য।

দ্বিতীয়ত, শারীরিক ও মানসিক সামর্থ্য থাকা। মানসিক বন্ধন অর্থাৎ ভালোবাসা, যত্ন ও পরিচর্যাসহ দাম্পত্য সম্পর্কের সবকিছুতে সমতা নিশ্চিত করতে পারার সক্ষমতা।

এই সুবিচার, সমতা বা আদল নিশ্চিত যদি না হয় তাহলে একাধিক বিয়ে বৈধ হয় না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একাধিক বিয়ের পরে কতটুকু সমতা রক্ষা হয় সেটা হিসেবে এনে তারপর আলাপ করা অধিক যুক্তিযুক্ত।

আবার সামাজিক অবস্থা ও প্রেক্ষাপট বিচারে মুবাহ বা বৈধ কাজও ইসলামে অপছন্দনীয় ও মাকরুহ হতে পারে।

অনেকে বহুবিবাহের পক্ষে প্রয়োজনের যুক্তি দেখান।

ধরুন স্ত্রীর দীর্ঘস্হায়ী কোন শারীরিক অসুস্থতা অথবা শারীরিক সম্পর্কে যেতে অনাগ্রহ ইত্যাদি।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে একাধিক বিয়ের অনুমতি স্ত্রীর জন্য আশীর্বাদ বলেও গণ্য হতে পারে। কারণ তাঁর অনাগ্রহ অথবা অসুস্থতায় কোনভাবে তাঁকে শারীরিক সম্পর্কে জোর বা বাধ্য করবার মত ব্যাপার গুলো বন্ধ করা সম্ভব হয়। আবার অসুস্থ বা দুর্বলতার সুযোগে তাকে বিবাহবিচ্ছেদের মতো যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে বাধ্য না করাও সম্ভবপর হয়।

যেহেতু সুবিচার শর্ত সেহেতু স্বামী কোনভাবে তাকে অবহেলা বা অপমান অথবা খোঁজ খবর রাখবে না এরকম করার পথ বন্ধ হয়।

দাম্পত্য সম্পর্কের ব্যাপারটি যেহেতু বিয়ের ক্ষেত্রে জরুরি ন তাই স্বামীর অবস্থা বিবেচনা করবার বিষয়টিও জাস্টিস বা সুবিচার নিশ্চিত করার মত একটা বিষয়। পুরুষের প্রয়োজনও উপেক্ষা করা যথাযথ হয় না ইসলামের দৃষ্টিতে।

প্রশ্ন হলো সুবিচার সুবিচার নিশ্চিত না হলে স্ত্রীর করণীয় কি? তিনি কি নিজের উপর অবিচার হতে দিবেন?

অবশ্যই না। একজন নারী নিজের জায়গা থেকে দুইভাবে বৈবাহিক সম্পর্কে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী করতে পারেন।

প্রথমত, বিয়ের আগে শর্তারোপ করতে পারেন যে, তাঁর সাথে বিবাহ চলাকালীন সময়ে পুরুষটি দ্বিতীয় কোন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারবেন না।

দ্বিতীয়ত, একাধিক স্ত্রী থাকলে নারী যদি মনে করেন তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, সমতা ও সুবিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে না, তাহলে বিচ্ছেদের দিকে যেতে পারেন। তাঁর পূর্ণ অধিকার থাকে এরকম পরিস্থিতিতে নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার।

লাগামহীন ভাবে পুরুষ একাধিক বিয়ে করতে পারবে, তাঁর কোন জবাবদিহিতা নেই বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়।

আবার যে সমাজে এই বৈধতার সুযোগে অন্যায় ও অনাচারের পথ তৈরি হয়, নারীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ ও অবিচারের পথ তৈরী হয় সেখানে এটির বৈধতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয় কারণ বৈধতার শর্ত (সমতা বা সুবিচার) যখন লুপ্ত হয় তখন বহুবিবাহের বৈধতার জায়গা কোথায় থাকছে সেটা হলো প্রশ্ন।

প্রশ্ন ওঠে কোনো ব্যক্তি ধরুন সন্তান জন্মদান পরবর্তী সময়ে প্রথম স্ত্রীকে ফেলে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিলেন। কোনভাবেই কি তিনি সমতা বা সুবিচার নিশ্চিত করবার মতোন কোন কাজ করলেন?

কথা হলো সন্তান স্ত্রীর একার নয়। বাবা হিসেবে সন্তানের প্রতি দেখাশোনা বা দায়িত্বশীল হবার নির্দেশ কি ইসলাম দেয় নি? সন্তানের অভিভাবকত্ব যদি কারো উপর থাকে তাঁর পক্ষে কোন ভাবেই কি সদ্য জন্ম নেয়া সন্তান ও স্ত্রীর অবস্থা বিবেচনা না করে নতুন বিবাহ ও খাহেশাত বা যৌনাকাঙ্ক্ষা মেটানোর উপায় খুঁজে বের করবার মতোন কাজ গুলো করা সম্ভব? সন্তান তো নারীর একার নয়। তাঁকে জন্ম দেয়া ও প্রতিপালনও নিশ্চয়ই স্ত্রীর একার উপর অর্পিত কোন দায়িত্ব নয়।

মানবিকতা, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ধর্ম কোন দিক থেকেই আসলে এ ধরনের কাজগুলো কে সঠিক হয়েছে বলার সুযোগ নেই।

পবিত্র কোরআনে স্বামী ও স্ত্রী কে একজন আরেকজনের পোশাক বা আবরণ হিসেবে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এরা একজন আরেকজন কে ছায়া দেবে। শান্তি, স্বস্তি ভালোবাসা দেবে। দুঃখ, বেদনা ও অসুস্থতায় ঢাল হয়ে থাকবে।

হাদীসে আছে সেই পুরুষ উত্তম যে তাঁর পরিবারের কাছে উত্তম।

ধর্মের মূল বিধান ও আলোচনায় এই বিষয়গুলো সবসময় প্রাসঙ্গিক।

সুতরাং এটা থেকে চোখ এড়ানোর সুযোগ আসলে নেই। যদি কেউ ধর্ম কে ঢাল হিসেবে নিয়ে অধর্ম করেন এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাও একরকম জরুরি বিষয় বলে গণ্য হতে পারে।

প্রশ্ন হতে পারে যে, নবীজি সাঃ তো বহুবিবাহ করেছিলেন সুতরাং এইটা বোধহয় ইসলামে উৎসাহিত করা হয়েছে।

একদমই এরকম নয় বিষয়টি। কারণ তিনি নিজের মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি পছন্দ করেন নি। এবং যথাযথ মনিটরিং করেছেন এ বিষয়ে।

প্রথম জীবনের ২৫ বছর একক স্ত্রী নিয়েই সংসার ছিলো তাঁর।

এরপর যে বিবাহ গুলো হয়েছে প্রায় সবই রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে। আরবের নানা গোত্র ও ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার একটা প্রেক্ষাপট ছিলো। তাঁর বিবাহ বিষয়টি সব মুসলমানের জন্য বৈধ কোন বিষয় নয়। এটির বিধান শুধু তার জন্যই নির্দিষ্ট ছিলো।

নারী দের আরো সচেতনতা জরুরি এসব নিয়ে। নারীদের উপেক্ষা করা হচ্ছে ধর্মে এমন কোন ধারণা মনে পুষে না রেখে ভালোভাবে জানুন সবকিছু।

শুধুমাত্র মেল পার্সপেক্টিভ থেকে নয়। নারী হিসেবে আপনার জায়গা থেকেও আপনার সুবিধা অসুবিধার প্রতিকার বিধান হতে হবে।

আপনার উপর ধর্মের আড়ালে অন্যায় এর পথ তৈরী হলে সেটা নিয়ে সচেতন হোন।