বাংলাদেশের ধীপ্রা কিংবা ভারতের ত্বিশা: আলোকিত ঘরের অন্ধকারের শিকার

নাজিয়া আফরিন
বাংলাদেশের ধীপ্রা কিংবা ভারতের ত্বিশা: আলোকিত ঘরের অন্ধকারের শিকার
ছবি: এআই/রোকেয়া কালেকটিভ গ্রাফিক্স

একটা মেয়ে তিন দিন ধরে তালাবদ্ধ ঘরে পড়ে আছে। খাবার দেওয়া হচ্ছে না, দুই বছরের সন্তানকে দেখতেও দেওয়া হচ্ছে না। বাড়ির অন্য সদস্যরা সবাই চিকিৎসক। অন্যের প্রাণ বাঁচানোই যাদের পেশা। মেয়েটিও নিজে চিকিৎসক। চতুর্থ দিন মায়ের আর্তিতে দরজা খোলে। মাকে জড়িয়ে ধরে মেয়েটি বলে, ‘মা, আমি ভাত খাব।’ তারপর মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। আর ওঠে না।

নাটক বা সিনেমা নয়, ঢাকার ধানমন্ডির একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটের গল্প এটি। ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার গল্প। একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, এফসিপিএস পরীক্ষার্থী এবং দুই বছরের এক শিশুর মা।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের মধ্যপ্রদেশে এমনই আরেকটি গল্প। ৩৩ বছরের ত্বিশা শর্মা। প্রাক্তন মিস পুনে, এমবিএ, অভিনেত্রী ও মডেল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হয়। ২০২৬ সালের ১২ মে ভোপালের নিজ শ্বশুরবাড়িতে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর শাশুড়ি গিরিবালা সিং প্রাক্তন জেলা জজ।

দুটি পরিবারের সামাজিক চিত্র প্রায় একই—ডিগ্রি, পদবি, প্রতিপত্তি। আর তার ছায়ায় মৃত্যু।

‘আলোকিত’ মানুষের অন্ধকার

ধীপ্রার শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদ বারডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের প্রধান। ধীপ্রার মৃত্যুতে দায়ের করা মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পুত্রবধূ অসুস্থ হলে তাঁকে কাছের হাসপাতালে না নিয়ে অনেক দূরের বারডেম হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, অসুস্থ অবস্থায় তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি, এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও বাধা দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর পর পোস্টমর্টেম ছাড়াই মৃত্যু সনদ সংগ্রহ করে দ্রুত দাফন সম্পন্ন করা হয়।

তবে মামলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. আব্দুর রশীদ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বলেন, মামলার বাদী ধীপ্রার পরিবারের কেউ নন এবং ধীপ্রার মা–বাবা তাঁকে চেনেন না। তিনি অভিযোগের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছেন বলেও জানা যায়।

ত্বিশার ক্ষেত্রে শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বক্তব্য আরও সরাসরি ও বিস্ফোরক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ত্বিশাকে মানসিকভাবে অসুস্থ, ‘দ্বৈত ব্যক্তিত্বের’ অধিকারী বলে দাবি করেন। গর্ভাবস্থায় মাদক গ্রহণের অভিযোগও তোলেন। আরও বিতর্ক তৈরি হয় একটি অডিও রেকর্ডিংকে ঘিরে, যেখানে ত্বিশার ভাইয়ের সঙ্গে কথোপকথনে গিরিবালা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক এবং চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

একজন বিশ্লেষকের মতে, এই ধরনের বয়ান মৃত নারীর একটি কাঠামোবদ্ধ নেতিবাচক চিত্র তৈরি করে, যেখানে স্বাধীনচেতা নারীকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

একজন প্রাক্তন বিচারক, যিনি জীবনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে ছিলেন, পুত্রবধূর মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যমে তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই নতুন বিতর্ক তৈরি করে।

শিক্ষা কি যথেষ্ট নয়?

দীর্ঘদিনের একটি ধারণা হলো, মেয়েদের শিক্ষিত করলে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু ধীপ্রা ও ত্বিশার ঘটনাগুলো সেই ধারণাকে আবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএ-র ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষার কোনো স্তর না থাকা নারীদের মধ্যে আজীবন নির্যাতনের হার ৭১.৫ শতাংশ। স্নাতক পর্যায়ের নারীদের ক্ষেত্রে এটি ৫৪.৮ শতাংশ। পার্থক্য থাকলেও শিক্ষা এককভাবে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। একই জরিপে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মূল কারণ অজ্ঞতা নয়, বরং কাঠামোগত সমস্যা। পিতৃতান্ত্রিক বিশ্বাস ও ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবার থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই শুধু ডিগ্রি বা পেশাগত অবস্থান এই বাস্তবতা বদলাতে পারে না।

মৃতের পর বিচার

দুটি ঘটনাতেই একটি মিল স্পষ্ট—মৃত নারীদের ঘিরে তাঁদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কোথাও অভিযোগ, কোথাও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ইঙ্গিত, আবার কোথাও সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক।

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে ১৩৩ জন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। প্রতিটি ঘটনার পরই অনেক ক্ষেত্রে নিহত নারীর আচরণ, ব্যক্তিগত জীবন বা ‘দোষ’ খুঁজে বের করার প্রবণতা দেখা যায়।

তাহলে পথ কোথায়?

প্রথমত, সমস্যার উৎসকে আলাদা করে দেখতে হবে। শুধু মেয়েদের নয়, ছেলেদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াও পরিবর্তন করা জরুরি। পরিবার, স্কুল ও সমাজে পিতৃতান্ত্রিক ধারণা পুনর্গঠন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার, বিশেষ করে যখন অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী অবস্থানে থাকেন। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের শিকার নারীদের একটি বড় অংশই অভিযোগ করেন না, আর যারা করেন তাদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

তৃতীয়ত, নিরাপদ সহায়তা ও যোগাযোগের কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে সংকটে থাকা নারীরা বাস্তব সহায়তা পান, শুধু সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া নয়।

ধীপ্রার শেষ কথা ছিল, ‘মা, আমি ভাত খাব।’ খুব সাধারণ একটি চাওয়া। খুব মৌলিক একটি অধিকার।

বাংলাদেশে ধীপ্রার ক্ষেত্রে এখনো অনেক তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে, এমনটাই প্রত্যাশা।